খুলনায় একের পর এক অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক মাসে পৃথক ঘটনায় ১৩ জনকে অপহরণের খবর পাওয়া গেছে। তবে অপরাধীদের ভয়ে মুক্তিপণ দিয়ে ফেরা অনেকে মুখ খুলতে চান না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিহ্নিত অপরাধীরা সংগঠিত হওয়া ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। তবে পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, যেকোনো অপরাধের পরই পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিচ্ছে। পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় ব্যবসায়ী কাজী নিজাম উদ্দিন সুজন গত ২১ ফেব্রুয়ারি মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হন। এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ব্যবসায়ী কাজী গ্রুপের স্বত্বাধিকারীর ছেলে ও সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজানের জামাতা। পুলিশের একাধিক টিম তাকে উদ্ধারে মাঠে কাজ করছে। একইভাবে খুলনা বিএনপির শীর্ষ এক নেতার ছেলে কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত জানুয়ারিতে সুন্দরবনের খালে ভ্রমণে গিয়ে দুই পর্যটক ও রিসোর্টের মালিককে অপহরণ করে বনদস্যুরা। দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান এ বিষয়ে জানান, ওই ঘটনার পর মুক্তিপণ দাবি করে বনদস্যুরা। পরে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার ও পর্যটকদের উদ্ধার করা হয়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে চিহ্নিত অপরাধীরা সংগঠিত হয়েছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা বাড়ছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পাইকগাছার গড়ইখালী ইউনিয়নে মাছের ঘের থেকে শেখ ইমরান হোসেন রিপন ও নাদির হোসেন লিটন নামে দুজনকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। এ বিষয়ে পাইকগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। অপহরণের চার দিন পর আড়াই লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার মধ্যস্থতায় তাদের করা উদ্ধার হয়।
এর আগে পাইকগাছা উপজেলার বাতিখালী গ্রামের ইমন হোসেন বাপ্পী ও সরল গ্রামের পল্লব নামে এক যুবককে খুলনা থেকে অপহরণ করা হয়। ইমন হোসেন বাপ্পী ও পল্লবকে অপহরণের ছয় দিন পর সাত লাখ টাকা চুক্তিতে মুক্তিপণ দিয়ে উদ্ধার করা হয়।
গত ১৫ জানুয়ারি নগরীর সোনাডাঙ্গার গুহা রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার নাজমুল হাসানকে অপহরণ করা হয়। পূর্ববিরোধের জেরে সোনাডাঙ্গা গাজী মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে তাকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। পরে পুলিশের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় তাকে ফেলে পালিয়ে যায় অপহরণকারীরা।
সোনাডাঙ্গা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অপহরণকারী সৌরভ একসময় ওই রেস্টুরেন্টে চাকরি করতেন। একটি ল্যাপটপ ও কিছু টাকার বিষয় নিয়ে তিনি চাকরিচ্যুত হন। এ ঘটনার জেরে নাজমুলকে অপহরণ করে প্রথমে বটিয়াঘাটা ও পরে পাইকগাছার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।’
এদিকে জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী কয়রা ও পাইকগাছার বিভিন্ন ব্যবসায়ী অপহরণসহ সুন্দরবনে জলদস্যুদের তৎপরতার অভিযোগ করেছেন। তিনি এগুলো বন্ধের জন্য পরিবেশ ও বনমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সর্বশেষ গত ২ মার্চ রাতে কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়নের গ্রামপুলিশ মাহবুবুর রহমানের মাদ্রাসা পড়ুয়া মেয়েকে বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয়। তিনি এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। এর তিন দিন আগে ওই শিক্ষার্থীকে অপহরণের হুমকি দেওয়া হয়। মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনার সময় তিনি মসজিদে নামাজে ছিলেন। বাড়ি ফিরে ঘরের মালামাল এলোমেলো দেখতে পান। তার মেয়েকে অপহরণের ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ এখনো তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।
তবে অপরাধ দমনে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘যেকোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সক্রিয় হচ্ছে। এলাকায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে।’