নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে আজ সোমবার চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যা অন্তর্বর্তী সরকারের এবং গভর্নর হিসেবে ড. আহসান এইচ মনসুরের প্রথম মুদ্রানীতি হবে। যেহেতু তিনি যোগদানের পর থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক দফা নীতি সুদহার বৃদ্ধিসহ বেশকিছু সিদ্ধান্ত আগেই বাস্তবায়ন করেছেন, ফলে এবারের মুদ্রানীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত আগের মতোই সংকোচনমূলক ধারাতেই থাকতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায়ও বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। মূলত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে আসা এবং রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল থাকায় এমন নীতি ঘোষণা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
‘দেশে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সবশেষ গত জানুয়ারিতে সার্বিকভাবে গড় মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। যা আগের মাস ডিসেম্বর শেষে ছিল ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিনিয়োগের অন্যতম নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে এই হার দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগের মাস নভেম্বর শেষে যা ছিল ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আর ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ৬ মাস হতে চলল। এ সময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে তিন দফা নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। যা বর্তমানে ১০ শতাংশ রয়েছে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে বাজারে টাকার সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন নতুন গভর্নর। যা দেরিতে হলেও কাজ করতে শুরু করেছে। সবশেষ জানুয়ারির গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এসেছে। আগামীতে তা আরও কমবে বলেই আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, তিন দফায় নীতি সুদহার বাড়ানোর প্রভাবে বাজারে সব ধরনের ঋণের সুদহার বেড়ে গেছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাও তলানিতে নেমে এসেছে। যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিবেচনায় সুদহার না বাড়িয়ে বরং কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এমন বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে এবং খাত সংশ্লিষ্টদের পরামর্শে নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন গভর্নর।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে বড় কোনো স্বস্তি ফেরানো গেছে, তেমন নয়। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিক যে অবনতি হচ্ছিল, তা ঠেকানো গেছে। বিশেষ করে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতির কারণে আগের মতো আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে তা ২০ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল আছে। তবে তারা নীতি সুদহার না বাড়িয়ে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার আগে গত জুলাই শেষে যা ২০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার ছিল; ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে যা ওই পর্যায়ে নেমেছিল। এর মধ্যে ৩৩০ কোটি ডলারের আগে বকেয়া পরিশোধের পরও রিজার্ভ একই জায়গায় থাকাকে আপাতত স্বস্তি বিবেচনা করা হচ্ছে। আবার ডলারের দর ১২২ থেকে ১২৪ টাকায় স্থিতিশীল আছে।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের-সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, আমরা ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ সব অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। এসব বৈঠকে গভর্নর বলেছেন যে, আমরা জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য দেখে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব। যদি মূল্যস্ফীতি কমে তাহলে হয়তো নীতি সুদহার আর বাড়ানো হবে না। জানুয়ারির পরে ফেব্রুয়ারিতে যদি মূল্যস্ফীতি আরও কিছুটা কমে তাহলে মার্চেই হয়তো নীতি সুদহার আরও কিছুটা কমানো হতে পারে। কারণ আমরা প্রতি তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করি এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। তিনি বলেন, উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ হচ্ছে না, কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। এখানে মূল সমস্যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সেই সঙ্গে বিনিয়োগের জন্য গ্যাস-বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও অনেকাংশে দায়ী। তবে এটা ঠিক যে, নীতি সুদহার বাড়লে ব্যাংকগুলো একটু চাপে থাকে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের বেশি সুদ দিতে হয়।
এর আগে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং রিজার্ভ বাড়ানোকে প্রধান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় গত বছরের ১৮ জুলাই চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় ব্যাংকগুলোতে ছিল তীব্র ডলারসংকট। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বেড়ে যায়।
পরিস্থিতি সামলাতে বিশ্বের অন্য দেশগুলো বেশ আগেই সুদহার বাড়ালেও উল্টো ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে সুদহারের সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সীমা দিয়ে রাখা হয়। অবশেষে প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে সুদহার তুলে দেওয়া হয়। যদিও অর্থনীতিবিদরা অনেক আগে থেকেই সেই পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু আগের গভর্নর তাদের পরামর্শ না দিয়ে নিজের মতো করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যার কারণে অর্থনীতিতে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল।