বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতার পাশাপাশি দেশেও চলছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। ফলে গত দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এতে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। আয় কমে যাওয়া ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকছে কম। যে কারণে অনেকেই সঞ্চয় করতে পারছেন না। এর প্রভাব পড়ছে ব্যাংক আমানতের ওপর। অনেকে সঞ্চয় থেকেও ভেঙে খাচ্ছেন। এর ফলে ব্যাংকের আমানতে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের একটি সংগতি থাকতে হয়। যদি আয় বেশি ও ব্যয় কম হয়, তাহলে মানুষ বাড়তি অর্থ সঞ্চয় করেন। এখন মানুষের আয় কমে গেলেও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ সঞ্চয় করতে পারছেন না। উল্টো ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন। এতে একদিকে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঞ্চয় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ কম হচ্ছে। এর প্রভাব হতে পারে চক্রাকার। যেমন বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান কম হবে, মানুষের আয়ও কমবে। নতুন শ্রমশক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ পাবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে উঠলেও পরের মাসেই তা আবার ৭ শতাংশে নেমে গেছে। অর্থাৎ আমানতের প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতি স্থায়ী হচ্ছে না। এর আগে, টানা চার মাস পর জানুয়ারিতে ব্যাংক খাতে আমানতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৮ শতাংশের ওপরে উঠেছিল, যা ফেব্রুয়ারিতে ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে গেছে।
আমানত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি ক্ষমতার পালাবদলের পর ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর অবস্থার চিত্র সামনে আনা হলে আস্থাহীনতাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের ব্যাংকে টাকা রাখা কমিয়ে দেওয়াকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেন ব্যাংকাররা। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তার আগে থেকেই ডলারসংকট, রিজার্ভের পতন, রেমিট্যান্স কমে যাওয়াসহ অর্থনীতিতে নানা সংকট ছিল। আন্দোলনের ধাক্কা সামলে উঠতে অন্তর্বর্তী সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও অর্থনীতিতে গতি আসেনি।
সরকার পতনের মাস আগস্টে ব্যাপক সহিংসতা, বিশৃঙ্খলার মধ্যেও ব্যাংক আমানতে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তথ্য দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে কমতে থাকে আমানত প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে যায়। এর আগে ব্যাংক খাত আমানতে এত কম প্রবৃদ্ধি দেখেছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সেবার ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। এরপর অক্টোবর থেকে তা আবার বাড়তে থাকে, তবে খুব ধীরগতিতে। অক্টোবরে সামান্য বেড়ে হয় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। নভেম্বরে আরও কিছুটা বেড়ে হয় ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে তা দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পরের মাস জানুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৮ শতাংশে উঠেছিল। তবে সব শেষ ফেব্রুয়ারি মাসে তা আবার কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে নেমে গেছে।
একই সঙ্গে সুদের হার বাড়ানোর পরও সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র বিক্রি এখন আর বাড়ছে না বরং কমে যাচ্ছে। অন্যান্য সঞ্চয়ী উপকরণেও নেতিবাচক অবস্থা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) মোট ৪৮ হাজার ৬১৫ কোটি বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকার। একই সময়ে গ্রাহকের আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের নগদায়ন বাবদ ৪৩ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে। এ কারণে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মানুষের বিনিয়োগের সক্ষমতা না থাকায় নতুন বিনিয়োগের চেয়ে ভাঙানোর প্রবণতা বেশি। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থবছর শেষে নিট ঋণ দাঁড়াবে ঋণাত্মক ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মানে, এ খাত থেকে সরকারের ঋণ কমে যাবে। যে পরিমাণ বিক্রি হবে, তার চেয়ে পরিশোধ করতে হবে বেশি। মূলত নতুন বিক্রির তুলনায় সঞ্চয়পত্রের নগদায়ন বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিশোধ বেশি হওয়ায় এ খাত থেকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে কোনো ঋণ পাবে না সরকার। উল্টো বাজেটের অন্য আয় থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা শোধ করতে হবে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরে পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। নিরাপত্তা ও অধিক মুনাফার আশায় মানুষ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। কিন্তু কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সুদ বেশি হওয়ার পরও সঞ্চয়পত্র কেনা কমিয়ে দিয়েছেন মানুষ। এমনকি সঞ্চয়পত্র ভাঙিয়ে ফেলার প্রবণতাও বেড়েছে।
এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য মানুষকে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো ১০ শতাংশের কাছাকাছি। পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ অন্য সব খাতেই খরচ বেড়েছে। এতে মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমে গেছে।
জানা যায়, মোট সঞ্চয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই হচ্ছে ব্যাংক খাতে। বাকি ১৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প এবং অন্যান্য খাত। সঞ্চয়ের প্রধান দুটি উপকরণ ব্যাংক আমানত ও জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প খাতে বিনিয়োগ বেশ কমে গেছে। নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রাইজবন্ডসহ অন্যান্য খাতেও সঞ্চয় কমেছে।