নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। যার প্রভাবে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন। এ সময় ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের ভেতরে এবং বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই লেনদেন বেড়েছে। দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। যদিও গত জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ভারত। বর্তমানে যার অবস্থান ৭ নাম্বারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
দেশের লেনদেন ইকোসিস্টেমে নগদ লেনদেনের প্রাধান্য অনেক বছর ধরেই রয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সরকার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে গ্রাহকরা ক্রমবর্ধমানভাবে ডিজিটাল আর্থিক উপকরণের দিকে ঝুঁকছেন। অর্থাৎ কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ভারতে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে যেখানে ভারত ছিল বাংলাদেশি কার্ড ব্যবহারকারীদের সর্বোচ্চ ব্যয়ের গন্তব্য, ২০২৫ সালের মে মাসে সেটি নেমে এসেছে সপ্তম স্থানে। গত বছরের মে মাসে ভারতে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বাংলাদেশিরা খরচ করেছিল ৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকা, আর চলতি বছরের মে মাসে তা নেমে এসেছে মাত্র ২১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ভারতে লেনদেন কমেছে ৫৫ কোটি টাকা বা ২৮ শতাংশ। আগের মাস এপ্রিলে এই লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি টাকা।
এই ধসের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি আরোপ। এর ফলে বাংলাদেশিদের ভারতমুখী ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে কার্ড লেনদেনেও। এদিকে চীনে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে চোখে পড়ার মতো উল্লম্ফন দেখা গেছে। গত বছর যেখানে চীনের নামই ছিল না শীর্ষ ব্যয়ের তালিকায়, সেখানে চলতি বছরের মে মাসে দেশটি উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। মে মাসে চীনে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ডে খরচ হয়েছে ৪০ কোটি ৪ লাখ টাকা, যা আগের মাসে ছিল মাত্র ১১ কোটি ৩ লাখ। এক মাসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশিরা বিদেশে মোট ৩৮৬ কোটি ৫ লাখ টাকা খরচ করেছে, যা আগের মাস এপ্রিলের তুলনায় ৮১ কোটি টাকা কম। দেশভিত্তিক ব্যয়ের তালিকায় সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে চীন (৪০ কোটি), থাইল্যান্ড (৩৫ কোটি), যুক্তরাজ্য (৩৪ কোটি), সিঙ্গাপুর (৩২ কোটি), মালয়েশিয়া (২৪ কোটি), নেদারল্যান্ডস ও সৌদি আরব (প্রতিটিতে ১৭ কোটি), কানাডা (১৬ কোটি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (১৩ কোটি) এবং অস্ট্রেলিয়া (১২ কোটি টাকা)। অন্যান্য দেশে খরচ হয়েছে ৬৭ কোটি টাকা।
ভারতে লেনদেন কমার কারণ জানতে চাইলে ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশিরা ভারতে যাওয়া কমিয়েছেন। তার আগের ডেটা বলছে, বাংলাদেশিরা ভারতেই সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ডে খরচ করতেন। প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়াতে বাংলাদেশিরা যে ভারতের বদলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে বেশি যাচ্ছেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের তথ্য সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।’
এদিকে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ বাড়িয়েছেন। চলতি বছরের মে মাসে তারা মোট ২৭৭ কোটি টাকা খরচ করেছেন, যা এক মাস আগের এপ্রিলের তুলনায় ১৫ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা খরচ করেছেন ১১৭ কোটি, যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা ২১ কোটি এবং ভারতীয় নাগরিকরা খরচ করেছেন ১৬ কোটি টাকা।
দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে দেশে কার্ড ব্যবহার করে খরচ হয়েছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা, যা এপ্রিল মাসের ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকার তুলনায় ২০৪ কোটি টাকা বেশি। সব মিলিয়ে, দেশের অভ্যন্তরে কার্ড ব্যবহার বাড়লেও বিদেশে ব্যবহারে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত উদ্যোগ নগদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসারে সফল হয়েছে এবং কার্ড ব্যবহারের অব্যাহত বৃদ্ধি বাংলাদেশে আরও ডিজিটালভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক বাস্তুতন্ত্রের দিকে ইতিবাচক প্রবণতা নির্দেশ করে। তবুও আশা করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এবং জনগণের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেলে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন বৃদ্ধি পেলে কার্ডের ব্যবহার দিন দিন টেকসই বৃদ্ধি পাবে।