বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। এ খাতের বিরাজমান সমস্যার সমাধানে পর্যটন ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে এলেও খুব একটা কাজ হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হলে পর্যটন খাতে আয় বাড়বে, যা সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে, ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার অভাব, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, প্রচার ও নিরাপত্তার অভাব। এ ছাড়া পর্যটকদের যাতায়াত, আবাসন এবং অন্যান্য সুবিধার জন্য মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ করা প্রয়োজন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রচারের জন্য সরকারি, বেসরকারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পর্যটন খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করে সেবার মান উন্নত করা যেতে পারে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা সহজ হবে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, পর্যটন খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। এ খাতে কিছু কিছু সমস্যা অনেক দিন ধরেই আছে। আমরা সরকারের কাছে এসব সমস্যার সমাধানে বার বার আবেদন জানিয়ে এলেও এখনো সমাধান হয়নি। আশা করি, এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। এতে সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ৫৫.৭ মিলিয়ন পর্যটক আকর্ষণ এবং ২ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে। আশা করি, এতে পর্যটন খাতে সুবাতাস বইবে।’
মো. রাফেউজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও কিছু সমস্যা এই শিল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এগুলো হচ্ছে- অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, মানসম্মত রাস্তার অভাব, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতা। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করে বাংলাদেশ পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘পর্যটন খাতের প্রসার হলে অনেক লোকের সমাগম হবে। অনেক ধরনের ব্যবসা বাড়বে। বিশেষভাবে যোগাযোগ খাতে আয় বাড়বে। হোটলে রেস্তোরাঁয় আয় বাড়বে। এভাবে বিভিন্ন খাতেই আয় বাড়বে।’
সর্বশেষ ১৯৯২ সালে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং ২০১০ সালে সেটি হালনাগাদও করা হয়। এখানে কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থান ঢেলে সাজানোর কথা বলা আছে। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে চোখে পড়ার মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প খাতে অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি হলেও রয়েছে অনেক দুর্বলতা। অনেক জায়গায় রাস্তা সরু ও বিপজ্জনক। নেই পর্যাপ্ত আধুনিক হোটেল ও মোটেল।
এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের পর্যটনকে শিল্পের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এখনো উপেক্ষিত এ খাত। আমাদের দিক থেকে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি করলেও পর্যাপ্ত বাজেট পাওয়া যায়নি। বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের কিছু অগ্রগতি হলেও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে।’
অর্থনীতির বিশ্লেষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে দেশে সব সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। এ অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বড় অন্তরায়। আশা করি, সামনে নির্বাচিত সরকার এলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। এতে পর্যটকরা দেশে আসবেন।’
আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো নানা সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলো তুলে ধরে। কিন্তু বাংলাদেশের পর্যটন এলাকাগুলোর তেমন প্রচার নেই।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা অবস্থার তেমন উন্নতি নেই। দুষ্ট লোকের খপ্পরে পড়ে বিদেশি পর্যটকদের মূল্যবান জিনিসপত্র হারানোর ঘটনাও রয়েছে অনেক। ছিনতাই ও চুরি থেকে পর্যটকদের রক্ষা করতে হবে। পর্যটকদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ দেশে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত (কক্সবাজার), সুন্দরবন, হাওর অঞ্চল, চা বাগান এবং পাহাড়ি বনভূমি দেশের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। বাংলাদেশ প্রাচীন মসজিদ, ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিভিন্ন উপজাতির বর্ণিল জীবনযাত্রা ও তাদের সংস্কৃতি পর্যটকদের কাছে খুবই মনোমুগ্ধকর। পর্যটন শিল্প দেশের জিডিপিতে অবদান রাখে, স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।