বরগুনা জেলায় এবার সরিষার অধিক ফলনে কৃষকরা খুশি। কুয়াশাছন্ন শীতের সকালে বরগুনায় শিশিরে ভেজা হলুদ সরিষা ফুলের খেতজুড়ে এক অপরূপ দৃশ্য বিরাজ করছে। বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী ও বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা এখন সোনালি সরিষা খেতে সোনালি স্বপ্ন বুনছেন। জেলার সরিষা খেতে হলুদ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, চলতি মৌসুমে আমন ধান কাটার পর পতিত ও এক ফসলি জমিতে সরিষা চাষ বেড়েছে। সরিষা চাষ কম খরচে স্বল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়ায় কৃষকদের কাছে এটি লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। এবার জেলায় বারি-১৪, ১৭, ১৮, ১৯ ও টরি-৭সহ উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করা যাবে। আর এতে কৃষকরা এক জমিতে দুই ফসল চাষ করে সুফল পাবেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরগুনা সদর উপজেলায় ১৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫ হেক্টর বেশি। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এ বছর সদর উপজেলার নলটোনা এবং বুড়িরচর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষার উল্লেখযোগ্য জাত হলো বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা-৯ এবং বিনা সরিষা-১১।
বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের কৃষক হামেদ মৃধা (৬০) বলেন, খরচ কম হওয়ায় এবার বেশি জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। ১৪ হাজার টাকা খরচ করে তিনি ৪০ কড়া জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। তার উৎপাদিত সরিষা বিক্রি করে ৪২ হাজার টাকা আয় করেছেন বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ঢলুয়া নলটোনা ইউনিয়নের কৃষক রবিউল (৫৫) জানান, এবার ২০ কড়া জমিতে ৭ হাজার খরচ টাকা করে সরিষার আবাদ করে ৩ গুণ লাভ করেছেন। আগামীতে আরও বেশি করে সরিষা আবাদ করবেন বলে জানান তিনি।
বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামের কৃষক গেন্দু মিয়া (৬২) জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার সরিষার অধিক ফলন হবে। তিনি ২০ কড়া জমিতে ৬ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে দিগুণের বেশি আয় করেছেন বলে জানিয়েছেন।
বরগুনা শহরের ভ্রাম্যমাণ সরিষা তেল ব্যবসায়ী কাইয়ুম হোসেন (৫২) বলেন, তিন বছর ধরে সরিষার তেলের ব্যবসা করে আসছেন। বরগুনায় ১২ মাস সরিষা পাওয়া যায় না, তাই উত্তরাঞ্চলের পাবনা জেলা থেকে সরিষা ক্রয় করে বরগুনায় এনে মেশিনে ভেঙে বিক্রি করেন।
তিনি জানান, প্রতি লিটার সরিষার তেল ২৪০ টাকা মূল্যে বিক্রি করেন। প্রতি মণ সরিষা ৩ হাজার ৭ শত টাকায় ক্রয় করে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার তেল বিক্রি করেন তিনি।
তিনি বলেন, বরগুনায় সরিষা তেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে, কিন্তু বরগুনায় সরিষার চাষ কম হওয়ায় অন্যান্য জেলা থেকে সরিষা ক্রয় করতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার লাকুরতলা এলাকার তেল ব্যবসায়ী মজিবর (৫৬) বলেন, বরগুনার নলটোনা ইউনিয়নে যে আবাদকৃত সরিষা ক্রয় করে মেশিনে ভেঙে শহরের বিভিন্ন এলাকায় কেজিপ্রতি ২৪০ টাকা দরে বিক্রি করি। প্রতি কেজিতে ৩০ টাকা লাভ হয়। জেলায় সরিষার তেলের অনেক চাহিদা আছে। বরগুনায় ১২ মাস সরিষা উৎপাদন হলে জেলার মানুষের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ হতো।
বরগুনা সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষকদের এ বছর প্রণোদনা দিয়েছি। বিশেষ করে নলটোনা ইউনিয়নের কৃষকদের বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এ ইউনিয়নের গাজী মাহমুদ গ্রামে এবার সরিষার অধিক ফলন হয়েছে। এ ছাড়া বুড়িরচর ইউনিয়নের গোলবুনিয়া গ্রামে ভালো ফলন হয়েছে।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সরিষা লাভজনক ফসল হওয়ায় উপজেলা কৃষি অফিস প্রদর্শনী বাস্তবায়ন, বীজ সহায়তা এবং উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কৃষকদের সরিষা চাষে আগ্রহী করে গড়ে তুলছেন। সরিষার আবাদ বৃদ্ধিতে আমরা কৃষকদের রোপা আমন জাতের আবাদ করার পরামর্শ প্রদান করছি, যাতে তারা আগাম সরিষা বুনতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া বিনা চাষে সরিষা আবাদেও দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করি, আগামীতে সদর উপজেলায় সরিষার আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং ভোজ্যতেল হিসেবে সূর্যমুখীর পাশাপাশি সরিষার তেল ব্যবহারেও আমরা সবাইকে সচেতন করতে সক্ষম হব।’
বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর জেলায় সরিষার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। হলুদ ফুলে ভরা সরিষা খেত শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং বরগুনার কৃষকের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সচেতন মহল মনে করছে, বরগুনার কৃষি বিভাগ উদ্যোগ নিলে জেলায় ১২ মাস সরিষার আবাদ হতে পারে। এ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। সে ক্ষেত্রে ক্রেতারা চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কম মূল্যে তেল ক্রয় করতে পারবে।