কক্সবাজারের মহেশখালীর অফশোর আইল্যান্ড সোনাদিয়া দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি আর দিগন্তজোড়া প্যারাবনের শ্যামলিমাঘেরা এই দ্বীপটি যেন প্রকৃতির এক আপন খেয়াল। জোয়ার-ভাটায় ভিজে ওঠা এই চরাঞ্চল আর প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঘাস দ্বীপটিকে মহিষ পালনের এক আদর্শ চারণভূমি করে তুলেছে। যুগ যুগ ধরে এই দ্বীপে মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছে মহেশখালীর শত শত পরিবার। তবে অমিত সম্ভাবনার এই খাতে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোর ও জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য।
সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবনের সবুজ ঘাস ও লোনা পানির ঝোপঝাড় মহিষের প্রধান খাদ্য। এখানকার মহিষগুলো মূলত মহেশখালী মূল ভূখণ্ডের মানুষের। দ্বীপের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে মালিকরা সেখানে মহিষের পাল লালন-পালন করেন। সাধারণত সোনাদিয়া দ্বীপের নির্দিষ্ট রাখালের তত্ত্বাবধানেই চলে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। কৃত্রিম খাবারের প্রয়োজন না হওয়ায় স্বল্প খরচে মহিষ পালন করা যায়। প্রতিবছর কোরবানির ঈদসহ বিভিন্ন মৌসুমে এই দ্বীপের মহিষের ব্যাপক চাহিদা থাকে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মেজবান ও ধর্মীয় উৎসবে সোনাদিয়ার মহিষের মাংসের কদর আলাদা। উপকূলীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই শিল্প বছরে কোটি টাকার জোগান দিচ্ছে।
উপকূলের জীবন যতটা শান্ত ততটাই সংঘাতময়। ভোরের আলো ফুটতেই যখন রাখালের বাঁশির সুরে মহিষের পাল প্যারাবনে ঢুকে পড়ে, তখন গাঙচিল, বক আর শত প্রজাতির পাখির ডানায় যেন নতুন স্বপ্নের রঙ লাগে। কিন্তু গোধূলি নামতেই শুরু হয় অন্য এক শঙ্কা। সাগরের শোঁ শোঁ শব্দ আর ঘন প্যারাবনের অন্ধকারকে পুঁজি করে হানা দেয় অপরাধী চক্র।
দ্বীপের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে কিছু অসাধু ও হিংস্র চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্বীপের কিছু লোক জলদস্যুতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা প্রায়ই রাতের আঁধারে মহিষের পাল থেকে হৃষ্টপুষ্ট মহিষ ট্রলারে করে পাচার করে দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো–অনেক সময় জলদস্যুরা দ্বীপে বসেই মহিষ জবেহ করে ভূরিভোজ করে।
মহিষের মালিক দেলোয়ার হোসেন জানান, সম্প্রতি সক্রিয় এক চোরচক্র তার পাঁচটি মহিষ চুরি করে নিয়ে গেছে। এমন ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের। ফলে অনেক গৃহস্থ লোকসানের ভয়ে এখন মহিষ পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। লবণাক্ত বাতাসে রোদে পোড়া চামড়া নিয়ে যে কৃষকরা স্বপ্ন বুনছেন, দস্যুতার কবলে পড়ে তাদের সেই স্বপ্ন এখন নোনা জলে মিশে যাচ্ছে। অনেক খামারি সর্বস্ব হারিয়ে এখন জীবিকার টানে সাগরে মাছ ধরতে নামছেন, যা এই সম্ভাবনাময় খাতের জন্য এক অশনিসংকেত।
সোনাদিয়া দ্বীপকে ঘিরে সরকারের পর্যটন উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ঐতিহ্যবাহী মহিষ পালন শিল্পকে রক্ষা করতে পারলে পর্যটনের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ খাতেও এই দ্বীপ অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদু রশিদ বলেন, ‘দ্বীপে একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বা কোস্ট গার্ডের সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি মহিষের কানে বিশেষ ট্যাগ ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল মালিকানা নিশ্চিত করে গভীর রাতে নৌ-টহল জোরদার করে পাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’
সোনাদিয়া দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী মহিষ পালন কেবল স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি নয়, বরং এটি দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহিষের পালের অবাধ বিচরণ পর্যটকদের চোখে এক অনন্য আকর্ষণ হয়ে ওঠে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এই শিল্পের বিকাশ ঘটানো গেলে সোনাদিয়া টেকসই উন্নয়নের একটি রোল মডেলে পরিণত হবে। মূলত সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই ঐতিহ্য রক্ষা করে দ্বীপটিকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা সম্ভব।