দেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে এসএমই খাতের উন্নয়নের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। এ খাতের উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। সে জন্য একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিমার্টমেন্ট) নওশাদ মোস্তফা, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিন, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। এ খাতের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ঢাকা চেম্বার ও সরকার একযোগে কাজ করতে পারে। একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্য আইনের সংস্কার কোনো বিকল্প নেই। শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
এ ছাড়া এরই মধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্পকারখানা চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ড. রাশেদ আরও বলেন, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতের কারণে দেশে মানুষের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট লাঘব হয়, সে বিষয়টি বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে। যে কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো বাড়ানো হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশের আর্থিক খাতের দুরবস্থার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত রয়েছি, তবে এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন, সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ঋণব্যবস্থা প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই।’
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্প খাতে উৎপাদন হ্রাস, বকেয়া ঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাস এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্প খাত মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং সময় অতিবাহিত করছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানো দরকার।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসএমই ফাইন্যান্সিং সহজীকরণ করার কোনো বিকল্প নেই। বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে। তবে সরকারের নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যার নিরসন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘আর্থিক খাতে আমাদের প্রকৃত তথ্যের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে, ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সরকারি সংস্থাসহ আর্থিক খাতের সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্রো ইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি না থাকার কারণে বেসরকারি খাতে চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না, এ জন্য ব্যবসা পরিচালনা সূচকে উন্নয়নের ওপর জোরারোপ করে। মূল্যস্ফীতিকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি রাখার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টি ব্যাংকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এ ধরনের ব্যবসায় এগিয়ে আসতে হবে। এসএসমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে তাদের ঋণদান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সিটি ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, আগামী বছর থেকে আইএফআরএস বাস্তবায়ন করা হবে। ফলে ব্যাংক খাতে ঋণের অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার সুযোগ কমবে, বাড়বে খেলাপি ঋণ, একই সঙ্গে কমবে ব্যাংকের সক্ষমতা।
তিনি জানান, এসএমই খাতের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের সীমা বাড়ানো এবং ঋণ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় তথ্যাদির সংখ্যা সীমিতকরণ জরুরি।
এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি মার্কেট প্লেস খুবই আবশ্যক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা না হলে উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হবে।