ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত সুদের হার আরও বাড়াতে পারে–এই আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গতকাল বুধবার মার্কিন ডলারের মান বেড়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ডলারের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ সীমার কাছে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কখন শেষ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ায় বৈশ্বিক বন্ডবাজারে বিক্রির চাপ দেখা দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গতকাল প্রতি ইউরোর দাম হয় ১ দশমিক ১৬০৮ ডলার। আগের দিন তা ৮ এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছিল। ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম ছিল ১ দশমিক ৩৩৯৮ ডলার; যা ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানের কাছাকাছি।
বৈশ্বিকভাবে ঝুঁকিপ্রবণ মুদ্রা হিসেবে পরিচিত অস্ট্রেলীয় ডলার শূন্য দশমিক ১৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৭০৯৭ ডলারে। নিউজিল্যান্ডের ডলার কমেছে শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ, মান দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৫৮২২ ডলারে।
বিশ্বের প্রধান ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে যে ডলার ইনডেক্স প্রণয়ন করা হয়, গতকাল তার মান ৯৯ দশমিক ৩০৬ পয়েন্টে স্থির আছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে–এমন প্রত্যাশায় মে মাসে সূচকটি ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
সিএমই ফেডওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি—বাজার এমনটাই ধারণা করছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে বাজারের ধারণা ছিল, তার আগে অন্তত দুবার সুদহার কমানো হতে পারে। ফেডের সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণীর দিকেও নজর রয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার মুদ্রাকৌশলবিদ ক্যারল কং মনে করেন, ফেডের কার্যবিবরণী থেকে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। এতে ডলার আরও শক্তিশালী হবে। তার ভাষ্য, এপ্রিলের বৈঠকের পর ফেডের অন্য নীতিনির্ধারকরাও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সতর্ক করেছেন। আমরা এখনো মনে করি, ডিসেম্বর থেকেই ফেড আবার কঠোর নীতির পথে হাঁটা শুরু করবে।
এপ্রিল মাসে যে নাজুক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান, তা মোটামুটি টিকে আছে। তবে বৈশ্বিক তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বাজারে উদ্বেগ কাটেনি। গতকাল প্রাথমিক লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১১০ দশমিক ৮ ডলার, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর আগে যে দাম ছিল, সে তুলনায় এই দাম অনেক বেশি।
ডলারের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে ইয়েনের মান আবারও প্রতি ডলারে ১৬০-এর কাছাকাছি চলে এসেছে। এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর গত মাসে প্রায় দুই বছরের মধ্যে এই প্রথম মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে জাপান।
রয়টার্সের সূত্র জানিয়েছে, এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে কয়েক দফায় বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে টোকিও। তবে তাতে ইয়েনের শক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সর্বশেষ প্রতি ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ছিল ১৫৯ দশমিক শূন্য ৩; এটি ৩০ এপ্রিলের পর সবচেয়ে দুর্বল।
ওসিবিসির মুদ্রাকৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওং বলেন, স্বল্প মেয়াদে অতিরিক্ত অস্থিরতাই বড় বিষয়। বিশেষ করে ১৬০ থেকে ১৬১ ইয়েনের সীমা এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রিস্টোফার আরও বলেন, ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর বাড়লে জাপান সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করবে–এ আশঙ্কার কারণে বাজারে এক ধরনের সতর্কতা থাকবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের মুনাফা ও সামগ্রিকভাবে ডলারের শক্তি না কমলে সরকারি পদক্ষেপে হয়তো সাময়িকভাবে এই উত্থানের গতি কমে যেতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক প্রবণতা বদলাবে না।