চতুর্থ অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (৩২৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-৪
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
দেবাশীষ কুমার রায় ছিলেন পিতার মতো সুপণ্ডিত। অধিক বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘রামাবতি’ সমাপ্ত করেন। তিনি পণ্ডিত ও জ্ঞানীদের রাজসভায় আমন্ত্রণ জানান। তার সময়ে অনেক কবির কাব্য প্রকাশিত হয়।
ক) কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা কে ছিলেন? ১
খ) মাৎস্যন্যায়ের যুগ বলতে কী বুঝ? ২
গ) রাজা দেবাশীষ কুমার রায়ের শিক্ষাবিষয়ক মানসিকতার সঙ্গে প্রাচীন যুগের কোন সেন রাজার মানসিকতার মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) ওই রাজার সাহিত্যবিষয়ক কর্মকাণ্ড ছাড়াও আরও অনেক কর্মকাণ্ড রয়েছে মতামত দাও। ৪
উত্তর: ক) কৈবর্ত বিদ্রোহের নেতা ছিলেন দিব্য। তিনি রাজশাহী অঞ্চলের একজন শক্তিশালী সামন্তপ্রধান ছিলেন।
খ) মাৎস্যন্যায়ের যুগ বলতে বোঝায় এমন এক সময়, যখন কোনো কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা না থাকায় সমাজে বিশৃঙ্খলা ও শাসনহীনতা সৃষ্টি হয়। প্রাচীন বাংলায় গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সমাজে তখন শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার চালাত এবং ওই সময় সমাজে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এই সময়কে ‘মাৎস্যন্যায়’ বলা হয়, যা আক্ষরিক অর্থে বোঝায় ‘মাছের বিচার,’ যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে।
গ) রাজা দেবাশীষ কুমার রায়ের শিক্ষাবিষয়ক মানসিকতার সঙ্গে প্রাচীন যুগের বল্লাল সেন বা লক্ষ্মণ সেনের মানসিকতার মিল পাওয়া যায়। দেবাশীষ কুমার রায় যেমন শিক্ষাবিস্তারে আগ্রহী ছিলেন এবং পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ রামাবতি সমাপ্ত করেন, তেমনি সেন বংশের রাজারাও শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর, ৩য় পর্ব
বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের শিক্ষানুরাগ এবং দেবাশীষ কুমার রায়ের মিলগুলো: তাদের মধ্যকার মিলগুলো নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো-
বল্লাল সেন এবং লক্ষ্মণ সেন উভয়েই প্রাচীন বাংলায় সাহিত্য, সংস্কৃতি, এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে উৎসাহী ছিলেন। সেন রাজারা বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং নিজেদের রাজসভায় বিদ্বান ও পণ্ডিতদের আহ্বান জানাতেন। লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকালে বাংলার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগতে এক নতুন জাগরণ ঘটে। তার সভায় কবি জয়দেব, উমাপতিধর প্রমুখ কবি এবং পণ্ডিতরা উপস্থিত ছিলেন, যারা সাহিত্য রচনা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধন করেন।
রাজা দেবাশীষ কুমার রায়ও প্রাচীন সেন রাজাদের এই ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেন। তিনি পিতার অসমাপ্ত কাব্য ‘রামাবতি’ সমাপ্ত করেন এবং তার রাজসভায় পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান। তার শাসনকালে অনেক কবির কাব্য প্রকাশিত হয়, যা প্রাচীন সেন রাজাদের শিক্ষানুরাগী মনোভাবের প্রতিফলন। তাই দেবাশীষ কুমার রায়ের মানসিকতার সঙ্গে প্রাচীন সেন রাজার মানসিকতার মিল রয়েছে।
রাজা দেবাশীষ কুমার রায়ের শিক্ষানুরাগী মনোভাব তাকে সেন রাজাদের শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী ভূমিকার সঙ্গে একাত্ম করে। তাদের রাজত্বকালেই বাংলা অঞ্চলে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, যা বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। সেন রাজারা যেমন সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং শিক্ষাকে উন্নীত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তেমনি দেবাশীষ কুমার রায়ও একই আদর্শ অনুসরণ করেন।
ঘ) দেবাশীষ কুমার রায় শুধু সাহিত্যবিষয়ক কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তার রাজত্বকালে তিনি প্রশাসনিক ও সামাজিক উন্নয়নেও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রাচীনকালে একজন রাজা কেবল সাহিত্য বা সংস্কৃতি নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকতেন না, বরং সামগ্রিকভাবে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা এবং প্রজাদের কল্যাণের দিকেও মনোযোগী হতেন। দেবাশীষ কুমার রায়ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।
দেবাশীষ কুমার রায়ের অন্যান্য কর্মকাণ্ড: তার অন্যান্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
১. প্রশাসনিক দক্ষতা: তিনি রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেন। শাসনব্যবস্থায় দক্ষতা আনয়নের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা উন্নত করেন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
২. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: দেবাশীষ কুমার রায়ের শাসনকালে অর্থনৈতিক দিকেও মনোযোগ দেওয়া হয়। কৃষি, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা রাজ্যের সমৃদ্ধি এবং প্রজাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।
৩. সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম: তিনি তার প্রজাদের কল্যাণে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এতে প্রজাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় এবং রাজ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
৪. ধর্মীয় সহাবস্থান: দেবাশীষ কুমার রায়ের রাজত্বে ধর্মীয় সহাবস্থান এবং বিভিন্ন ধর্মের প্রতি সহনশীল মনোভাব লক্ষ করা যায়। তিনি ধর্মীয় ক্ষেত্রে সহাবস্থান এবং শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখেন, যা প্রজাদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে।
উপরোক্ত আলোচনা শেষে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেবাশীষ কুমার রায়ের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তাকে সেন রাজাদের মতো উচ্চমানসম্পন্ন শাসক হিসেবে পরিগণিত করেছে। তবে তার কর্মযজ্ঞ সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের উন্নয়নে তার ভূমিকা রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছিল।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর