লালন সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। এর আগে অসুস্থতা নিয়ে দীর্ঘদিন একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। তার চিকিৎসার জন্য সে সময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গঠন করা হয়েছিল মেডিকেল বোর্ডও। এর পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছিলেন এই শিল্পী। গত মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন ফরিদা পারভীন। এর পর রাতে কয়েক দফা বমি ও রক্তক্ষরণজনিত কারণে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এই নন্দিত শিল্পী।
এই শিল্পীকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা। আর এই উন্নত চিকিৎসার জন্য আবারও প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা। ফরিদা পারভীনের কোনো সন্তান বলছেন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহয়তা প্রয়োজন, আবার কোনো সন্তান বলছেন আর্থিক সহায়তার দরকার নেই। শিল্পীর চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে পারিবারিক দূরত্ব থাকায় একেকজন একেকরকম মতামত দিচ্ছেন। যেখানে এই শিল্পীকে বাঁচাতে এখন পারিবারিক ঐক্যের প্রয়োজন, সেখানেই বাড়ছে ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোন্দল ও দূরত্ব। এ জন্য ফরিদা পারভীনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে এই পারিবারিক কলহ।
এমনটি খবরের কাগজকে জানিয়েছে ফরিদা পারভীনের বড় ছেলে ইমাম।
ইমাম বলেন, “আম্মার শারীরিক অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। অনেকেই ভাবছেন আমার আম্মার (ফরিদা পারভীন) অনেক টাকা। অনেক টাকা থাকলে আমরা আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে অথবা দেশের ভেতর আরও ভালো হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারতাম। আম্মার চিকিৎসা চলছে তার কুষ্টিয়ার বাড়িভাড়া থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে। পাশাপাশি আমার বাবা গাজী আব্দুল হাকিম এবং ভাই-বোনেরা কিছু টাকা দেন। এভাবে তো আর ভালো চিকিৎসা করা সম্ভব না। আর একেক ভাই একেক রকম কথা বলছেন। এর আগে সরকার থেকে দশ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল আম্মার চিকিৎসার জন্য। কিন্তু এই টাকা ভাই-বোনদের জন্য আমরা গ্রহণ করিনি। কারণ তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্টেটমেন্ট দিয়েছিল চিকিৎসার জন্য টাকার প্রয়োজন নেই। এখনো যদি এমন কথা বলেন তারা, তা হলে তা খুবই দুঃখজনক।
আমাদের আসলে আর্থিক সহযোগিতা দরকার। এ ছাড়া বেশি প্রয়োজন উন্নতমানের চিকিৎসা। আম্মার উন্নত চিকিৎসার জন্য যদি সরকার আগের মতো এগিয়ে আসে, তা হলে অনেক ভালো হয়। আমরা সংস্কৃতি উপদেষ্টাকে বিষয়টি জানিয়েছি। তিনিও আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, ‘পারিবারিক কিছু ঝামেলা আছে। কিন্তু সেই ঝামেলা যদি আম্মার চিকিৎসাসেবায় প্রভাব পড়ে, তবে এর চেয়ে দুঃখজনক কিছু হওয়ার নেই।’
ফরিদা পারভীনের স্বামী একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশের কিংবদন্তি বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফরিদা পারভীনের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। এ ছাড়া দ্রুত তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চাই। আমার একটাই চাওয়া ও প্রত্যাশা, রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি ফরিদা পারভীনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হতো, তবে ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকব সরকারের প্রতি।’
ফরিদা পারভীনের স্বামী বিষণ্ন কণ্ঠে আরও বলেন, ‘ফরিদার করোনা হয়েছিল। এর পর থেকেই শরীর কিছুটা ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া কিডনির সমস্যাটা ২০১৯ সাল থেকেই চলছে। ডায়ালাইসিস শুরুর পর শরীর আরও দুর্বল হয়ে গেছে। অনেক দিন ধরে আবার লিভারের রোগও আছে। ফুসফুসে পানি জমেছে, ডায়াবেটিসের সমস্যাও আছে। সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা সংকটাপন্ন। আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা করানো অনেক ব্যয়বহুল। প্রতিদিন প্রায় লাখ টাকা খরচ হয়। ফরিদা কোনো কথা বলতে পারে না, শুধু তাকিয়ে থাকে।’
/আবরার জাহিন