জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্প নির্দেশক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তরুণ ঘোষ আর নেই।
বুধবার (৮ এপ্রিল) রাতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন চিত্রশিল্পী কিবরিয়া কাজী।
তিনি জানান, অ্যাজমা থেকে সৃষ্ট জটিলতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এই গুণী শিল্পী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৩ বছর।
১৯৫৩ সালের ২০ আগস্ট রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন তরুণ ঘোষ। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের বরোদার এম এস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। ১৯৭৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষকদের একজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ফোক পেইন্টিং রিসার্চ অ্যান্ড ডকুমেন্টেশন প্রোগ্রাম’-এ কাজ করেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন শেষে ২০১২ সালে কিপার পদ থেকে অবসর নেন। এরপর স্বাধীন শিল্পী হিসেবে কাজ চালিয়ে যান।
চিত্রকলার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনায়ও তিনি রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আবু সাইয়ীদ পরিচালিত চলচ্চিত্র কিত্তনখোলা ছবির জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।
এছাড়া তারেক মাসুদের মাটির ময়না, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নরসুন্দর এবং এন রাশেদ চৌধুরীর চন্দ্রাবতী কথা-সহ একাধিক চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন।
সবশেষ তিনি ‘সখী রঙ্গমালা’ সিনেমায় শিল্প নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করেন।
তার চিত্রকর্মে বাংলার লোকঐতিহ্য, মিথ ও ইতিহাস আধুনিক ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে। বিশেষভাবে প্রশংসিত তার ‘বেহুলা’ সিরিজ, যা এশিয়ান আর্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বৃহৎ ক্যানভাস থেকে শুরু করে পাখি, প্রকৃতি, প্রতিকৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা দিক তার কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।
তার মৃত্যুতে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শিল্পী কিবরিয়া কাজী স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৭৯ সালে রাজশাহী চারুকলায় প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়া তরুণ ঘোষের সঙ্গে তার দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি এখন কেবল স্মৃতির অ্যালবাম। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার দুই দিন আগেও তাদের দীর্ঘ আড্ডা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শিল্পী কারু তিতাস বলেন, চারুকলার প্রথম জীবনের শিক্ষক ছিলেন তরুণ ঘোষ। মৃত্যুর আগের দিনও বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তাদের দীর্ঘ আড্ডা হয়। ‘কে জানতো সেটাই শেষ দেখা’- লিখে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
কারু তিতাস বলেন, দেশের একজন মূল্যবান শিল্পী হিসেবে জীবদ্দশায় যথাযথ মূল্যায়ন পাননি তরুণ ঘোষ। গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয় এবং তার মরদেহ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জয়ন্ত সাহা/অমিয়/