আল মাহমুদ রবীন্দ্রচিন্তা অনুধাবন করে বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ হলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আত্মা। বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন যেকোনো লোকের চিরকাল অহংকার করার মতো যদি কিছু অক্ষয় সম্পদ থেকে থাকে, তাহলো তার সাহিত্য। আর এ সাহিত্য-সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি অংশটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একার সৃষ্টি। এ যে কেমন অসম্ভব সম্ভব হয়েছে, আমি তোমাদের কী করে বোঝাব! কিছুকাল পরে তোমরা যখন প্রাচীন বাংলা সাহিত্য পড়তে পড়তে হঠাৎ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দ্বারদেশে এসে দাঁড়াবে আর দেখবে বিশাল সোনার তোরণ আকাশ ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তোমরা বুঝতে পারবে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য কী কাণ্ড করে গেছেন!’
আল মাহমুদ বাংলা কবিতার এক সুউচ্চ মিনার। পঞ্চাশের দশকের কবিদের মধ্যে তিনি কেবল শীর্ষস্থানীয়ই নন, স্বতন্ত্র এক ঘরানার উদ্যোক্তা। কিন্তু স্বৈরাচারের সমর্থন আর বিরোধিতার সূত্র ধরে আল মাহমুদ অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে ছিলেন। কেবল কলমের জোরেই সেসব বাধা অতিক্রম করে আল মাহমুদ ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যখন দেশের কবি-শিল্পী-সাংবাদিক রাজপথে, তখন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আয়োজন করেন এশীয় কবিতা উৎসব। উদ্দেশ্য ছিল কবি-সাহিত্যিকদের সমর্থন আদায়। এরশাদ যেহেতু নিজের নামে ‘কনক প্রদীপ জ্বালো’ প্রকাশ করেছেন, যেহেতু পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তার নামে কবিতা ছাপা হয়, তখন তিনি কবিতা উৎসবের আয়োজন করে কবিদের মধ্যমণি হয়ে উঠতে চাইলেন। তার সেই এশীয় কবিতা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হন সৈয়দ আলী আহসান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখ খ্যাতিমান কবি। সরকারির চাকরি করেন এমন কজন কবিও এতে অংশ নিতে বাধ্য হন। এই এশীয় কবিতা উৎসবের প্রতিবাদে সে সময়ের তরুণ কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও মোহন রায়হানের উদ্যোগে গঠিত হয় জাতীয় কবিতা পরিষদ। তাদের গঠিত জাতীয় কবিতা পরিষদ এবং আয়োজিত কবিতা উৎসবে যোগ দেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল, কবি আবুল হোসেন, কবি ফয়েজ আহমদ, কবি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কবি শামসুর রাহমান, কবি সৈয়দ শামসুল হক-সহ ষাট-সত্তর-আশির-দশকের কবিরা। এরশাদের পতনের আগেও এশীয় কবিতা উৎসব আর কবিতা কেন্দ্র অচল হয়ে পড়ে। জাতীয় কবিতা পরিষদ এখনো সচল রয়েছে। কিন্তু পঞ্চাশের কবিতায় রাহমান-মাহমুদ নামে দুটি ধারার সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনো বহমান।
আল মাহমুদ কবি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ছড়া রচনায় সিদ্ধিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এমনকি সাহিত্য-সমালোচনায়ও তার মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। আবার ছোটোদের উপযোগী গ্রন্থের সমালোচনায় তিনি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার বিচ্ছিন্ন রচনাগুলো ‘তোমাদের জন্য বই’ (২৯২৩) নামে গ্রন্থিত হয়েছে ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে। আমরা এখানে একজন আল মাহমুদের সমালোচক-সত্তার পরিচয় পেয়ে গৌরব বোধ করতে পারি। তিনি যেসব লেখক-সম্পাদকদের বই নিয়ে সমালোচনা করেছেন, তারা হলেন সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, হাবীবুর রহমান, শামসুল হক, আতোয়ার রহমান, আবুল কাশেম চৌধুরী, হালিমা খাতুন, হায়াৎ মামুদ ও শামসুজ্জামান খান।
সুফিয়া কামালের ছড়ার বই ‘ইতল বিতল’ নিয়ে ছোটোদের কাছে সহজ-সরল ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সুফিয়া কামালের সঙ্গে তোমাদের সবারই অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। ক্লাসের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে অসংখ্য পত্রপত্রিকায় এখনো তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। কৈশোর থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত তিনি অক্লান্তভাবে লিখে গেছেন। এখনো যে তিনি লিখতে পারেন ‘ইতল বিতল’ই তার প্রমাণ।’ সুফিয়া কামালের সাহিত্যের প্রতি আস্থা ও প্রশংসা জানাতে এটুকু মন্তব্যই যথেষ্ট এবং তা জানাতে কার্পণ্য করেননি আল মাহমুদ। বিখ্যাত কিশোর-উপন্যাস ‘রাণীখালের সাঁকো’ নিয়ে বলতে গিয়ে আহসান হাবীবের কবিত্বের কথা বলেছেন। তার পর উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ শেষে পেশ করেছেন মন্তব্য, ‘একটি নিটল গল্প রূপকথার ভাষায় তিনি তোমাদের জন্য সাজিয়েছেন’। এটুকুতেই উপন্যাসটির গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। ফররুখ আহমদের ‘পাখীর বাসা’ বই নিয়ে আলোচনার সুযোগে আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘পাখীর বাসা’ বইটিতে শুধু যে পাখিদের ঘর-সংসার সম্বন্ধে বলা হয়েছে, তা নয়। এই বইয়ে ‘পাখ-পাখালী’ নামের একটি অংশে পাখিদের স্বভাব-চরিত্র সম্বন্ধে অনেক বৃত্তান্ত বলা হয়েছে, আর এমনভাবে হয়েছে, যাতে রচনাগুলো ইচ্ছে করলেই তোমরা সুর বেঁধে গান বানিয়ে ফেলতে পার এবং অনায়াসে গাইতেও পার। বোঝো, কেমন মজার ব্যাপার! সবগুলো পাখি আর তাদের বাসা সম্বন্ধে একটা করে গান জানা থাকলে তোমাদের কেমন আনন্দ হয়।’ বলেছেন শিশু-কিশোর পাঠকদের উদ্দেশ্যে, যাতে এই সমালোচনা পড়ে তারা উদ্বুদ্ধ হয় ফররুখের বই পড়তে।
হাবীবুর রহমানের ‘হীরা মতি পান্না’ গ্রন্থের আলোচনা করতে তার কবিত্ব নিয়ে প্রশংসার পাশাপাশি গল্পের ভাষা নিয়েও চমৎকার কথা বলেছেন। মাহমুদের ভাষায়- ‘হাবীবুর রহমানের গল্প বলার ঢংটাই আলাদা। তার গদ্যভঙ্গিতে এমন কবিত্ব আছে যে একবার পড়া আরম্ভ করলে শেষ তো করতেই হবে এবং তার পরও কতক্ষণ বইটি হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে। লেখক এ দেশের একজন নামকরা সনেট রচয়িতা। কবি বলেই হয়তো তার গদ্যরচনায় কাব্যগন্ধী শব্দের প্রয়োগ বেশি। হীরা মনিক পান্নার সারাংশ এমন ঝরঝরভাবে স্পষ্ট করে তোলা হয়েছে যে প্রত্যেকটি রচনা জমাট এবং নিখুঁত হয়েছে।’ সমালোচনার ভাষাও যে ঝরঝরে হতে পারে আল মাহমুদ তা করে দেখালেন। শামসুল হকের ‘বই পড়া ভারী মজা’, আতোয়ার রহমানের ‘টুনটুনের বাঁশী’, হালিমা খাতুনের ‘সোনা পুতুলের বিয়ে’ প্রভৃতি বই নিয়ে এমন সুন্দর আলোচনা করেছেন, যা পড়ে কেবল ছোটোরাই নন, অভিভাবকরাও উপকৃত হবেন। মৌলিক বইয়ের পাশাপাশি আবুল কাশেম চৌধুরী ও শামসুজ্জামান খানের দুটি সম্পাদনা বইও তার সমালোচনার দৃষ্টিতে রয়েছে। বাদ পড়েনি হায়াৎ মামুদের ‘রবীন্দ্রনাথ: কিশোর জীবনী’। এ আলোচনা-সূত্রে আমরা আল মাহমুদের রবীন্দ্রচিন্তাও অনুধাবন করতে পারি। তিনি বলেছেন-
‘রবীন্দ্রনাথ হলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আত্মা। বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন যেকোনো লোকের চিরকাল অহংকার করার মতো যদি কিছু অক্ষয় সম্পদ থেকে থাকে, তাহলো তার সাহিত্য। আর এ সাহিত্য-সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি অংশটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একার সৃষ্টি। এ যে কেমন অসম্ভব সম্ভব হয়েছে, আমি তোমাদের কী করে বোঝাব! কিছুকাল পরে তোমরা যখন প্রাচীন বাংলা সাহিত্য পড়তে পড়তে হঠাৎ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দ্বারদেশে এসে দাঁড়াবে আর দেখবে বিশাল সোনার তোরণ আকাশ ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে, তখন তোমরা বুঝতে পারবে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য কী কাণ্ড করে গেছেন!’
আল মাহমুদের এ সমালোচনা নিবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছিল সৈয়দ মোহাম্মদ শফি ও এখলাসউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘টাপুর টুপুর’ পত্রিকায় ১৯৬৬-৬৭ সালে। ঐতিহ্য প্রকাশনীর আরিফুর রহমান নাইমকে ধন্যবাদ এ লেখাগুলো গ্রন্থনার মাধ্যমে আল মাহমুদের সমালোচক-সত্তাকে তুলে ধরার জন্য। আল মাহমুদ যে সমালোচনা-সাহিত্যেও দক্ষতার ছাপ রেখেছেন, এ শিশুতোষ রচনাগুলোই তার প্রমাণ বহন করে।