বর্তমান সময়ে ব্রেইন টিউমার বা মস্তিষ্কের ক্যানসার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রযুক্তি, জীবনধারা ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্রেইন টিউমার হলো মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি, যা স্বাভাবিক কোষকে বিকৃত এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। এটি সবার জন্যই বিপজ্জনক। কারণ মস্তিষ্ক মানবদেহের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র।
ব্রেইন টিউমারের কারণ
◉ জেনেটিক ও বংশগত প্রভাব
পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ সিন্ড্রোম যেমন Li-Fraumeni Syndrome, Turcot Syndrome, Gorlin Syndrome ইত্যাদি মস্তিষ্কের টিউমারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।
কিছু জিনে মিউটেশন যেমন TP53, PTEN, NF1, NF2 সরাসরি টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
◉ পরিবেশগত কারণ
অতিরিক্ত রেডিয়েশন বা বিকিরণ (বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত রেডিয়েশন)।
রাসায়নিক ও টক্সিনের সংস্পর্শ, যেমন-পেস্টিসাইড, হাইড্রোকার্বন, শিল্পে কেমিক্যাল।
◉ ভূমি ও পানিদূষণ
ভারী ধাতু যেমন- সিসা বা আর্সেনিক দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার-মোবাইল ব্যবহার নিয়ে সম্ভাব্য গবেষণা চলছে।
◉ বয়স ও লিঙ্গ
ব্রেইন টিউমার সব বয়সের মানুষের মধ্যে দেখা যেতে পারে, তবে বয়স ৫০ বছরের পর বেশি হয়।
কিছু প্রকারের টিউমার (যেমন-Meningioma) নারীদের মধ্যে বেশি, অন্য প্রকার (যেমন- Glioblastoma) পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
◉ স্বাস্থ্য ও জীবনধারা
স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।
ধূমপান ও অ্যালকোহল ব্যবহারের ফলে ঝুঁকি বাড়ে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যেমন- প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও তেল।
দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক চাপ মস্তিষ্কের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
◉ ভাইরাস ও সংক্রমণ
কিছু ভাইরাস সংক্রমণ যেমন- Epstein-Barr Virus (EBV), JC Virus এবং বিরলভাবে Herpesvirus মস্তিষ্কের টিউমারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা সংক্রমণও টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
◉ হরমোনাল ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গীয় কারণ
কিছু টিউমার হরমোনের সঙ্গে সংযুক্ত, যেমন- Pituitary tumors।
হরমোনের অমিল বা থাইরয়েড সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করতে পারে।
◉ আঘাত ও মাথার চোট
বারবার মাথায় চোট বা ট্রমা মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি এবং টিউমারের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
◉ পেশাগত ঝুঁকি
রাসায়নিক বা তামা, প্লাস্টিক, পলিউভিনাইল, শিল্পপ্রদূষিত পরিবেশে কাজ করা ব্যক্তিদের ঝুঁকি কিছুটা বেশি।
◉ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও পুষ্টির অভাব
ভিটামিন A, C, E, সেলেনিয়াম এবং ওমেগা-৩-এর অভাব দীর্ঘমেয়াদে কোষের ক্ষতি এবং টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
লক্ষণ ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ প্রাথমিক অবস্থায় অস্পষ্ট থাকতে পারে। লক্ষণগুলো টিউমারের অবস্থান ও আকারের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
◉ শারীরিক লক্ষণ: মাথাব্যথা, বিশেষ করে সকালবেলা বা রাতে বেড়ে যাওয়া। বমি বা বমি ভাব। দৃষ্টি সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা বা ডাবল ভিশন। চলাচলে সমস্যা, ভারসাম্য হারানো। হাত বা পায়ের দুর্বলতা বা অনিয়মিত কম্পন।
◉মানসিক ও স্নায়বিক লক্ষণ: স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগে সমস্যা। আচরণ পরিবর্তন বা মানসিক চাপ। কথা বলার সমস্যা, যেমন-শব্দ খুঁজে না পাওয়া বা বাক্য গঠন না পারা।
◉ অপ্রত্যাশিত সংক্রমণ ও অবসাদ: ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি। জ্বর বা সংক্রমণ সংক্রান্ত লক্ষণ সাধারণত দেখা যায় না, তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে।
প্রকারভেদ
◉ গ্লায়োমাস (Gliomas)
উৎস: মস্তিষ্কের গ্লিয়াল কোষ থেকে তৈরি।
বৈশিষ্ট্য: মস্তিষ্কের কার্যকরী কোষকে সহায়তা ও সুরক্ষা প্রদান করে,
বয়স: সব বয়সে হতে পারে
◉মেনিনজিওমাস (Meningiomas)
উৎস: মস্তিষ্কের আস্তরণ মেনিনজিস থেকে উদ্ভূত।
বৈশিষ্ট্য: সাধারণত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
বয়স: ৪০+ বয়সী নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
◉ পিটুইটারি টিউমার (Pituitary tumors)
উৎস: পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে তৈরি।
বৈশিষ্ট্য: হরমোনের নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে।
বয়স: ৩০-৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি হয়।
◉ মেডুলোব্লাস্টোমাস (Medulloblastomas)
উৎস: মস্তিষ্কের ছোট অংশ (Cerebellum) থেকে তৈরি।
বৈশিষ্ট্য: সাধারণত দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
বয়স: সাধারণত শিশুদের মধ্যে বেশি হয়।
◉ এপেন্ডিমোমাস (Ependymomas)
উৎস: মস্তিষ্কের চেম্বার বা স্পাইনাল ক্যানাল থেকে উদ্ভূত।
বৈশিষ্ট্য: সেরিব্রাল ফ্লুইড বা স্পাইনাল ফ্লুইডের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বয়স: শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের মধ্যে দেখা যায়।
জটিলতা
ব্রেইন টিউমারের জটিলতা তার ধরন, আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। প্রধান জটিলতা হলো—
◉ নিউরোলজিক্যাল জটিলতা: চলাচলে অসুবিধা। হাত-পায়ের দুর্বলতা। কথা বলার বা চিন্তা করার সমস্যা। স্নায়ুর ক্ষতি।
◉ সিরোসম্যাটিক জটিলতা: মাথার ভেতরে চাপ বৃদ্ধি, যার ফলে বমি, মাথাব্যথা, চোখের দৃষ্টি সমস্যা।
◉ মৃত্যুর ঝুঁকি: Malignant বা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক টিউমার দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
◉ চিকিৎসাসংক্রান্ত জটিলতা: সার্জারি বা রেডিয়েশন থেরাপি প্রায়ই কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন- স্মৃতিভ্রংশ, ক্লান্তি, সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ
মস্তিষ্কের রোগ বা অন্যান্য জটিল অসুস্থতার ক্ষেত্রে রোগীর দৈনন্দিন জীবন ও সুস্থতা রক্ষায় পুষ্টি ও শারীরিক অনুশীলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ এবং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। এ ছাড়া মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা, যেমন- ধ্যান, যোগব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম রোগীর মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরকে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
লেখক: চিকিৎসক, গবেষক এবং কলাম লেখক



