গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে যেমন আমাদের ঘন ঘন পিপাসা পায়, শীতকালে তেমনটি হয় না। ফলে অজান্তেই আমরা কম পানি পান করি। অথচ শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে পানি অত্যন্ত জরুরি। শীতকালে পানি কম পান করার পাশাপাশি শরীর গরম রাখতে অতিরিক্ত চা বা কফি খাওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কম হাঁটাচলা, ব্যায়ামের অভাব এবং আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়ার অভ্যাস। এসব কারণ মিলেই শীতকালে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
কোষ্ঠকাঠিন্য বলতে মূলত পায়খানা শক্ত হয়ে যাওয়া, নিয়মিত মলত্যাগ না হওয়া বা পেট পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতিকে বোঝায়। অনেক সময় মলত্যাগ করতে দীর্ঘক্ষণ কষ্ট করতে হয়, এমনকি পায়খানা করার পরও মনে হয় পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। এটি একটি খুব সাধারণ কিন্তু অবহেলিত স্বাস্থ্য সমস্যা।
অনেকে মনে করেন, দৈনিক একবার পায়খানা হলেই যথেষ্ট। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। কারও কারও দু-তিন দিন বা তারও বেশি সময় পর পায়খানা হয়, তবুও তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিক ধরে নেন। দীর্ঘদিন এভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য চলতে থাকলে অর্শ বা পাইলস, এনাল ফিশার (মলদ্বারে ফাটা), এমনকি অন্যান্য জটিল পায়ুপথের রোগ তৈরি হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ
সাধারণভাবে সপ্তাহে তিনবারের কম পায়খানা হলে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয়। এ ছাড়া যে লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে—
পায়খানা খুব শক্ত বা শুকনো হওয়া
মলত্যাগে অতিরিক্ত চাপ দিতে হওয়া
পেট ফাঁপা, ব্যথা বা গ্যাসের সমস্যা
বমি বমি ভাব বা খাবারে অরুচি
পেট পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি
কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রধান কারণ
কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী—
খাবারে পর্যাপ্ত ফাইবার বা আঁশের অভাব
পর্যাপ্ত পানি না পান করা
শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামের অভাব
পায়খানার বেগ চেপে রাখা
মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগলে যে জটিলতা হতে পারে-
অর্শ বা পাইলস
এনাল ফিশার বা মলদ্বারে ক্ষত
মলদ্বার বেরিয়ে আসা (রেকটাল প্রোলাপস)
পায়খানা ধরে রাখতে না পারা
অন্ত্রের বিভিন্ন জটিল সমস্যা
শীতে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে বাঁচতে করণীয়
কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে ওষুধ ছাড়াই কোষ্ঠকাঠিন্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
খেজুর: প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ২-৩টি ভেজানো খেজুর খেলে হজম শক্তিশালী হয় এবং মল নরম রাখতে সাহায্য করে।
মেথি বীজ: এক চা-চামচ মেথি বীজ সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খেলে অন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়ে।
ঘি: এক গ্লাস কুসুম গরম দুধের সঙ্গে এক চা-চামচ ঘি দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী হতে পারে (উচ্চ রক্তচাপ থাকলে এড়িয়ে চলুন)।
আমলকী: আমলকীর রস বা গুঁড়া হজমে সহায়ক এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে কার্যকর।
কিশমিশ: ভেজানো কিশমিশ ফাইবারের ভালো উৎস এবং সহজে হজম হয়।
এ ছাড়া শীতকালীন শাকসবজি; যেমন- লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক, লালশাক, মুলা ও টমেটো— খাবারের তালিকায় নিয়মিত রাখা উচিত। এগুলো ফাইবারসমৃদ্ধ এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
লেখক: চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক



