বর্তমান বিশ্বে ক্যানসার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা। এর মধ্যে নারীদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক রোগগুলোর একটি হলো স্তন ক্যানসার। সময়মতো শনাক্ত না হলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং রোগী ও পরিবারের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। স্তন ক্যানসার শুধু একজন নারীর স্বাস্থ্যসমস্যা নয়; এটি পুরো পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
স্তন ক্যানসার কীভাবে হয়
স্তন ক্যানসার তখন হয় যখন স্তনের কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় কোষ নিয়মিতভাবে বিভাজিত হয় এবং পুরোনো কোষের জায়গায় নতুন কোষ তৈরি হয়। কোনো কারণে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে টিউমার তৈরি হয়। যদি টিউমার ম্যালিগন্যান্ট হয়, তবে তা আশপাশের টিস্যু ও শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ঝুঁকির কারণ
কিছু বিষয় এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমন-
বয়স ৪০ বছরের বেশি
পরিবারের কারও স্তন ক্যানসারের ইতিহাস
নিঃসন্তান কিংবা সন্তানকে স্তন্যপান না করানো
দীর্ঘদিন হরমোন ওষুধের ব্যবহার
স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও অ্যালকোহল
মানসিক চাপ ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা।
গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের কোনো সদস্য স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হলে অন্য নারীর ঝুঁকি সাধারণের তুলনায় ২২–৩০ শতাংশ বেশি।
লক্ষণ
স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো ব্যথা থাকে না। তবে কিছু লক্ষণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা দেয়—
স্তনে বা বগলে শক্ত বা নরম গাঁট অনুভব হওয়া
স্তনের আকার বা আকৃতির হঠাৎ পরিবর্তন
নিপল ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা আকৃতি বিকৃত হওয়া
নিপল থেকে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ
স্তনের ত্বক লাল বা খসখসে হয়ে যাওয়া, কমলার খোসার মতো চেহারা
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা জ্বালাপোড়া
কাঁধ, ঘাড় বা হাতে ব্যথা
এই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা
মাসে একবার নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা করা রোগ শনাক্তের একটি কার্যকর পদ্ধতি। যেভাবে পরীক্ষা করতে হবে—
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তনের আকার, ত্বক ও নিপলের পরিবর্তন লক্ষ করা।
আঙুল দিয়ে বৃত্তাকারে পুরো স্তন ও বগল পরীক্ষা করা।
কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে দ্রুত পরীক্ষা করানো। এই অভ্যাস রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং
ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন (CBE): চিকিৎসকের মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা করানো
ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসাউন্ড: টিউমার নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণ
যাদের পারিবারিক ঝুঁকি বেশি, তাদের আরও আগে থেকে স্ক্রিনিং করানো জরুরি। সময়মতো পরীক্ষা করালে চিকিৎসা পরিকল্পনা সহজ হয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব
প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারা
স্তন ক্যানসার পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব না হলেও ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো যায়—
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
ধূমপান, তামাক ও অ্যালকোহল পরিহার
সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং
এই অভ্যাসগুলো রোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলতে চাই, স্তন ক্যানসার ভয়ংকর হলেও সচেতনতা ও সময়মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিয়মিত পরীক্ষা, সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। রোগ সম্পর্কে জ্ঞান, সতর্কতা এবং সঠিক চিকিৎসা গ্রহণই মূল প্রতিরোধ।
ভয় নয়, সচেতন থাকুন, নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন— এটাই স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
লেখক: কলাম লেখক ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রবন্ধকার



