সব ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মাধ্যমে পোপ ফ্রান্সিসকে সমাহিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষ। ভ্যাটিকানের সীমানার বাইরে সান্তা মারিয়া মেজর ব্যাসিলিকায় তাকে সমাহিত করা হয়। গত ১০০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো পোপকে ভ্যাটিকানের বাইরে সমাহিত করা হলো। সমাহিত করার আগে সেখানে একান্তে একটি সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ভ্যাটিকানে রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সদ্যপ্রয়াত ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে যোগ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ বিশ্বনেতারা। শনিবার (২৬ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের ব্যাসিলিকা গির্জার সামনের চত্বরে পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু হয়। পোপের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্ত্যেক্রিয়ার অনুষ্ঠান ছিল আড়ম্বরহীন।
সংবাদদাতারা জানান, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পোপের কফিন ধীরে ধীরে এক শোভাযাত্রার মাধ্যমে রোমের সান্তা মারিয়া মেজর ব্যাসিলিকায় সমাহিত করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। শোভাযাত্রাটি ভ্যাটিকান সিটি থেকে বেরিয়ে আরও ছয় কিলোমিটার অর্থাৎ পৌনে চার মাইল পথ পাড়ি দেয়। সাধারণ মানুষ রাস্তার দুই পাশে স্থাপিত ব্যারিকেডের পেছন থেকে শোক শোভাযাত্রাটি অনুসরণ করেন। পথে পথে তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছিলেন, যারা তীর্থযাত্রীদের দিকনির্দেশনা, চিকিৎসা সহায়তা ও পানি সরবরাহ করেছেন।
ঐতিহ্যগতভাবে পোপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বিস্তৃত ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু পোপ ফ্রান্সিস পুরো প্রক্রিয়াটি অপেক্ষাকৃত কম জটিল করার একটি পরিকল্পনায় মৃত্যুর কয়েক দিন আগে অনুমোদন দেন। আগের পোপদের সাইপ্রেস, সিসা ও ওক কাঠে তৈরি তিন স্তরের কফিনে ভরে সমাহিত করা হয়েছে। পোপ ফ্রান্সিস দস্তা দিয়ে মোড়ানো সাধারণ কাঠের তৈরি একটি কফিনে তাকে সমাহিত করার বিষয়ে অনুমোদন দিয়ে গেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা নিবেদন
গত শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে পোপ ফ্রান্সিসের মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন অধ্যাপক ইউনূসের কাছের একজন বড় ভক্ত। তিনি বারবার ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে অধ্যাপক ইউনূসের ‘তিন শূন্য’ নীতি, যেখানে পৃথিবীতে কোনো দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণ থাকবে না, তা পোপ ফ্রান্সিস গভীরভাবে সমর্থন করতেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ড. ইউনূসের সঙ্গে যৌথভাবে ভ্যাটিকানে ‘তিন শূন্য উদ্যোগ’ চালু করেন পোপ। পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে যোগ দিতে এবং তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার ইতালির রোম পৌঁছান অধ্যাপক ইউনূস। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমানটি রোমে পৌঁছায়। সেখানে ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান।
প্রধান উপদেষ্টা ও বিশ্বনেতাদের যোগদান
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শনিবার ভ্যাটিকান সিটি সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিয়েছেন। অধ্যাপক ইউনূস বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং বিশিষ্টজনদের মাঝে আসন গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রিন্স উইলিয়ামসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতা এবং বিশিষ্টজন যোগ দেন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, স্পেনের রাজা ফিলিপ ষষ্ঠ ও রানি লেতিজিয়া, জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার, বিদায়ী চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ, ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেল্লা এবং প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় নেতা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন।
লাখো মানুষের অংশগ্রহণে পোপকে বিদায়
শনিবার পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দেন ক্যাথলিক ধর্মানুসারী থেকে শুরু করে শোকাহত লাখো মানুষ। ভ্যাটিকানের তথ্য অনুসারে, সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের চারপাশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ জড়ো হন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অন্তত ১৬২টি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল, যার মধ্যে প্রায় ৫০ জন রাষ্ট্রপ্রধান ও ১০ জন ক্ষমতাসীন রাজা। আরও উপস্থিত ছিলেন ২০০ জনেরও বেশি কার্ডিনাল এবং প্রায় ৪ হাজার ধর্মযাজক। ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাতিও পিয়ানতেদোসি জানিয়েছেন, পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে ৪ লাখ মানুষ সেন্ট পিটার্স স্কয়ার ও এর আশপাশের রাস্তায় জমায়েত হন। অনুষ্ঠান শুরুর এক ঘণ্টা আগে ৪০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট পিটার্স স্কয়ার প্রায় পূর্ণ হয়ে যায়। ভ্যাটিকানের দিকে যাওয়া ভিয়া দেলা কনসিলিয়াজিওন সড়ক এবং আশপাশের রাস্তায় প্রায় ১ লাখ মানুষ আগেই উপস্থিত হন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় জনসাধারণের জন্য পোপ ফ্রান্সিসকে প্রদর্শন শেষ হয়। এই তিন দিনে আড়াই লাখের বেশি মানুষ পোপ ফ্রান্সিসকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ভ্যাটিকান।
বেশ কিছুদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২১ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু হয়। ২৩ এপ্রিল সকালে তার মরদেহ সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় আনা হয়। ভক্তরা যাতে এই ধর্মগুরুকে শেষবারের মতো দেখতে পারেন, সে লক্ষ্যে ওই দিন সারা রাত খোলা রাখা হয়েছিল ব্যাসিলিকা।
পোপ ফ্রান্সিস ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ সময় তিনি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করে সবার পক্ষ থেকে তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টিতেও তার বক্তব্য বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ হাউস পরিদর্শন
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শুক্রবার রোমে অবস্থিত (বাংলাদেশ দূতাবাস) বাংলাদেশ হাউস পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি সেখানে রাখা পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ তথ্য জানান।
রবিবার ফিরছেন প্রধান উপদেষ্টা
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শেষে রবিবার (২৭ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা) ড. ইউনূস রোমের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিমানবন্দর থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন বলে জানিয়েছেন তার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। সোমবার ভোরে তার ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে। তথ্যসূত্র: বাসস/ ইউএনবি/বিবিসি/রয়টার্স