সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে কয়েক দশকের সামরিক উদ্ভাবনের প্রয়োগ ঘটায় ইসরায়েল। এর মধ্যদিয়ে দেশটি প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং কৌশলগত সমন্বয়ের নজির গড়েছে বলে টাইমস অব ইসরায়েলের বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। ১ জুলাই ‘ইসরায়েলস টুয়েলভ ডে ওয়ার উইথ ইরান ওয়াজ আ টেস্ট অব টেকনোলজিক্যাল ডোমিন্যান্স’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হুমকির বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেহারাই বদলে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
টাইমস অব ইসরায়েলের সামরিক প্রতিবেদক স্টিভ লেভাটন তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, সংঘাত শুরু হয় ১৩ জুন ইসরায়েলের ‘সুনির্দিষ্ট, প্রতিরোধমূলক হামলা’ দিয়ে। এটি ছিল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী সামরিক লড়াই। ‘রাইজিং লায়ন’ নামের ওই অভিযানে ইসরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে শত শত বিমান হামলা চালায়। ইরানের পাল্টা হামলার জবাবে ইসরায়েল ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং বহু স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও সক্রিয় করে তোলে। ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এ সংঘাতের ইতি ঘটে।
বিমান প্রতিরক্ষা দৃঢ় ছিল
প্রথম দিকে প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল মনে হলেও তথ্য অনুযায়ী ইসরায়েলের বহু স্তরের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৬ শতাংশ সফলতা দেখিয়েছে; যা আগেও দেখা গেছে। যুদ্ধ শুরুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে নতুন আপগ্রেডের অ্যারো সিস্টেম মোতায়েন করার ফলে সফলতার হার আরও বেড়ে যায়। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের সংখ্যা যদিও বেশি মনে হয়েছে। এর মূল কারণ ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত। তারা আঘাতের জন্য বেসামরিক জনবহুল এলাকাকে টার্গেট করে। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাই বেশি ক্ষতি হয় এবং মানুষের নজরে আসে। এসব ইরানি হামলায় ২৮ জন নিহত হন। তিন হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন। আরও ১৩ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। তবে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণে যে সম্ভাব্য ধ্বংসকে প্রতিহত করা হয়েছে, তার পরিমাণ ছিল প্রকৃত ক্ষতির চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি। এর আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ এখন পর্যন্ত ১০ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
ড্রোন বদলে দেয় যুদ্ধের রূপরেখা
ইরানি ড্রোনের ৯৯ শতাংশের বেশি ইসরায়েল প্রতিহত করতে পেরেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। এই সাফল্যের পেছনে ছিল আপডেট করা নতুন প্রযুক্তি এবং আগের সফল পরীক্ষিত আয়রন ডোম। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. ড্যানিয়েল গোল্ড বলেন, ইসরায়েলের এই প্রচেষ্টা রক্ষাকবচ ও আক্রমণ- দুই ক্ষেত্রেই খুব সফল হয়েছে। তার মতে, ‘ইরানের শক্তিশালী সক্ষমতা ছিল, কিন্তু ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা সেই ক্ষমতাকে হার মানিয়েছে।’ বড় পরিবর্তন ঘটেছে ইসরায়েলের ড্রোন ব্যবহারে। ইরানের গভীরে ঢুকে পাঁচ শতাধিক হামলা ও প্রতিরোধমূলক আঘাত চালানো হয়। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। গোল্ড বলেন, ‘এটা ছিল গাজার কৌশল ইরানে নিয়ে যাওয়া, অর্থাৎ ইসরায়েল ইরানের আকাশে যেমন দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে কাজ করেছে, তেমনটা করেছিল গাজাতেও।’ এই ড্রোনের ব্যবহার পাইলটদের ঝুঁকি কমিয়েছে এবং ইরানের অভিযান পরিচালনার ক্ষমতাও হঠাৎ করে ভেঙে দিয়েছে।
নজরদারির দৃষ্টান্ত
ইসরায়েলি স্যাটেলাইটগুলো সংঘাত চলাকালে দিনে ও রাতে উচ্চ রেজল্যুশনে কোটি কোটি বর্গকিলোমিটার চিত্র ধারণ এবং ১২ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট চিত্র সংগ্রহ করেছে। এসব ছবি বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন শত শত লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয় এবং তা গোপনে পরিচালনা করা হয়। এই স্যাটেলাইট নজরদারি ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সকে (আইডিএফ) রিয়েল টাইমে (চলমান সময়ে) কৌশল পরিবর্তন করতে সহায়তা করেছে এবং যুদ্ধের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তগ্রহণে ব্যাপক সাহায্য করেছে।
সিদ্ধান্তমূলক শুরু
১৩ জুন ভোরে ইসরায়েল ‘রেড ওয়েডিং’ নামের অপারেশন শুরু করে। এটি ছিল ইরানি পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও উচ্চপদস্থ নেতাদের ওপর নির্ভুল আগাম হামলা। এই অভিযানে ২০০-এর বেশি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান অংশ নেয় এবং ৩৩০টির বেশি বোমা প্রায় ১০০টি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ফেলা হয়। এই বোমাগুলো ছিল উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি, যা গত দুই দশকে প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই অস্ত্রগুলো ইলেকট্রনিক যুদ্ধাবস্থায়ও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নিজস্ব আত্মরক্ষামূলক সিস্টেমও মোতায়েন করে, যা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়।
ভবিষ্যতের উদ্ভাবন
এই যুদ্ধ ছিল স্থল, আকাশ, মহাকাশ ও সাইবার জগৎজুড়ে প্রযুক্তির বাস্তব এবং যৌথ ব্যবহারের এক বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যে লাভ হয়েছে তা এই সংঘাতে প্রমাণিত হয়। যুদ্ধের খরচ অনেক কম হয়েছে। কারণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কয়েক গুণ বেশি ক্ষতিকে প্রতিরোধ করা গেছে। ইরান এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে তার অস্ত্র ও কৌশল উন্নত করছে। তবে ইসরায়েলও থেমে নেই। তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধাও স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা প্যাটেল বলেছেন, ‘আমরা প্রতিটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পরবর্তী প্রজন্মের উদ্ভাবনের দিকে যাচ্ছি… আমরা ইরানকে চমকে দেওয়ার জন্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুত করছি।’ তবে ইরানও যে এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে না, ইসরায়েল সেটা জানে।