উত্তর কোরিয়া তাদের সর্বশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ)।
গতকাল শুক্রবার রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে স্বয়ং নেতা কিম জং উন উপস্থিত ছিলেন।
এই কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়ার সর্বাধুনিক অস্ত্রসম্ভারের প্রদর্শনী হয়—এর মধ্যে ছিল দীর্ঘপাল্লার কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন উৎক্ষেপণযান। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে নতুন উন্মোচিত ‘হুয়াসং–২০’ আইসিবিএম, যাকে কেসিএনএ বর্ণনা করেছে দেশের “সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থা” হিসেবে।
১১-অক্ষ বিশিষ্ট একটি বিশাল ট্রাক লঞ্চারে স্থাপন করা হাওসঙ–২০ এর অস্তিত্ব সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসে, যখন উত্তর কোরিয়া নতুন এক কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিনের সফল পরীক্ষা চালায়।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি এই ইঞ্জিন ১ হাজার ৯৭১ কিলোনিউটন ধাক্কা উৎপাদন করতে সক্ষম—যা দেশটির আগের রকেট ইঞ্জিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস এর বিশেষজ্ঞ আনকিট পান্ডা বলেন, হুয়াসং –২০ উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘপাল্লার পারমাণবিক সক্ষমতার শীর্ষ প্রকাশ। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরের শেষ নাগাদ এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হবে।
হুয়াসং সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উত্তর কোরিয়াকে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা দিয়েছে, তবে এখনো প্রশ্ন থেকে গেছে এর গাইডেন্স সিস্টেমের নিখুঁততা এবং বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় ওয়ারহেডের স্থায়িত্ব নিয়ে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হুয়াসং –২০ একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিম জং উন তার সামরিক বাহিনীকে বহু ওয়ারহেড বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা সহজ হয়।
পান্ডা বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভবত বহু ওয়ারহেড বহনের উপযোগী। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াবে এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে কিমের কৌশলকে শক্তিশালী করবে।
কিম জং উনের ভাষণ ও রাশিয়ার সঙ্গে সংহতি
কুচকাওয়াজ শেষে কিম জং উন ভাষণে বলেন, “উত্তর কোরিয়া আজ সমাজতান্ত্রিক শক্তির এক বিশ্বস্ত সদস্য এবং পশ্চিমাদের বিশ্ব আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার দুর্গ।” তিনি যোগ করেন, “আজ আমরা এমন এক শক্তিশালী জাতি, যার সামনে কোনো বাধা টিকতে পারে না, কোনো অর্জন অসম্ভব নয়।”
এই অনুষ্ঠান ঘিরে পিয়ংইয়ং সফরে ছিলেন রাশিয়ার নিরাপত্তা কাউন্সিলের উপপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিমিত্রি মেদভেদেভ।
রুশ সংবাদ সংস্থাগুলোর খবরে বলা হয়েছে, কিমের সঙ্গে বৈঠকে মেদভেদেভ ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রতি উত্তর কোরিয়ার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রুশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ম্যাক্স’-এ মেদভেদেভ লিখেছেন, “মানুষ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক সংকটকালেই প্রকৃত অর্থে প্রকাশ পায়। আমাদের দুই দেশের জোটের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। আমরা কৃতজ্ঞ উত্তর কোরিয়ার প্রতি, যারা আমাদের ‘বিশেষ সামরিক অভিযানে’ অবিচল সমর্থন দিয়েছে। কুর্স্ক অঞ্চল মুক্ত করতে আমাদের সেনারা একসঙ্গে লড়েছে—এই ঐতিহাসিক বন্ধন চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
প্রতিউত্তরে কিম জং উন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিনিময় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বলে জানিয়েছে কেসিএনএ। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/