ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে আসছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার সফর নয়াদিল্লির কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। বিশ্বের ভারসাম্য বদলাচ্ছে এবং পশ্চিমের চাপ বাড়ছে- এমন সময়ে দুপক্ষই প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে চাইছে।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দিল্লিতে অবতরণ করবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
বিশ্লেষকরা আশা করছেন দু’পক্ষের মধ্যে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পারমাণবিক সহযোগিতা, পেমেন্ট ব্যবস্থা, ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনসহ অন্যান্য বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে একটি উচ্চাভিলাষী আলোচনা হবে।
পুতিন এমন এক মুহূর্তে ভারতে আসছেন যখন, রাশিয়ার তেল কেনা, নতুন শুল্ক এবং ইউক্রেন শান্তি আলোচনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, ভারত বা রাশিয়ার কেউই এই সফরকে পশ্চিমের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখাতে চান না।
২০২১ সালের পর এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এটাই তার প্রথম ভারত সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এই দু’দিনের সফর ভারতের মস্কোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাকে পরীক্ষা করবে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক প্রবীণ সাওনি পুতিনের সফর নিয়ে বলেন, ‘২০২৫ সালে ভারতের জন্য এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফর। এটি একটি বহুমুখী সফর, যে দেশটি ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের বন্ধু, এবং এমন এক সময়ে যখন বিশ্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবীণ দোনথি এ বিষয়ে বলেন, ‘এই সফর দুপক্ষকেই তীব্র চাপের মধ্যেও তাদের বিশেষ সম্পর্ক পুনর্নিশ্চিত করার সুযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শাস্তিমূলক শুল্কের চাপের মধ্যে।’
স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির ফেলো অকৃতি বাসুদেব কল্যাণকর বলেন, ‘এই সফর ভারতের রাশিয়া-নীতির একটি স্থিতিশীল পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চার বছর পর পুতিনের প্রথম ভারত সফর থেকে বোঝা যায়, ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে রাশিয়া নিয়ে বিতর্ক মোটামুটি মিটে গেছে। মস্কো এখন নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার এবং এমন এক সুবিধাজনক প্রতিরক্ষা সহযোগী যারা প্রযুক্তি হস্তান্তরে অনেক বেশি ইচ্ছুক।’
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত চুক্তি
সম্মেলনে প্রতিরক্ষাই প্রধান বিষয় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ ত্বরান্বিত করতে এবং সম্ভবত পঞ্চম প্রজন্মের সুখোই সু-৫৭ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করতে চায়।
সাওনি বলেন, ‘সম্প্রতি মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ থেকে ভারত অনেক শিক্ষা নিয়েছে, তাই এখন প্রতিরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
মস্কো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, উৎপাদন লাইন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আরও যৌথ প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে।
সম্মেলনের আগেই মস্কো ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অব লজিস্টিকস এগ্রিমেন্ট (RELOS)’ অনুমোদন করেছে, যা আলোচনায় থাকবে। এই চুক্তির অধীনে দু’দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটিতে জ্বালানি, মেরামত ও সরবরাহের সুবিধা দেবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ভারত মহাসাগরে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান মনোযোগের ইঙ্গিত এবং ভারতকে রাশিয়ার আর্কটিক ও উত্তর সমুদ্রপথে পদক্ষেপের সুযোগ করে দেবে।
জ্বালানি, পারমাণবিক সহযোগিতা ও বাণিজ্য
রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের মধ্যেও ভারত-রাশিয়া জ্বালানি সম্পর্ক সম্মেলনের কেন্দ্রে থাকবে।
অক্টোবরে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মোদি তাকে ‘অল্প সময়ের মধ্যে’ রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে দিল্লি এই মন্তব্য নিশ্চিত করেনি।
ভারত সরকারের একজন মুখপাত্র পরে জানান, ‘আমদানির সিদ্ধান্ত ভারতীয় ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা এবং অস্থির জ্বালানি বাজারের সম্পূর্ণভাবে তাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
বর্তমানে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী, যদিও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ওলেগ ইগনাতভ বলেন, ‘ভারতের পক্ষে রাশিয়ার তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। ভারত ছাড়ে দেওয়া রাশিয়ার তেল দেশীয় ব্যবহার এবং রপ্তানি দুটির জন্যই ব্যবহার করে।
পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সহযোগিতা
পারমাণবিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। তামিলনাডুর কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাধিক ইউনিট রাশিয়া তৈরি করছে।
সাওনি বলেন, ‘রাশিয়া ভারতে বেসামরিক পারমাণবিক কাজ অনেক করছে। এখন আমরা ছোট মডিউলার পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরের পরবর্তী পর্যায়ে যাচ্ছি।’
বাণিজ্য আলোচনা
২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাণিজ্যও ভারত-রাশিয়ার মধ্যে মুখ্য আলোচনা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য রেকর্ড ৬৮.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে- মহামারির আগের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ।
রাশিয়া-নেতৃত্বাধীন ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সাওনি জানান। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতাও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।
পশ্চিমের প্রতি বৈশ্বিক বার্তা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফর ভারতের কূটনৈতিক স্বাধীনতারও একটি বার্তা বহন করে। ভারতের জন্য কৌশলগত স্বাধীনতা দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা জানান, মস্কো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সমান-সমানের সম্পর্ক হিসেবে দেখে এবং এই সফর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিচ্ছে যে, চাপ সত্ত্বেও নয়াদিল্লি ও মস্কো নিরাপত্তা, জ্বালানি ও বহুপাক্ষিক ফোরামে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে পুতিন দেখাতে চান যে, নিষেধাজ্ঞার চাপ সত্ত্বেও রাশিয়া ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে জ্বালানি ক্ষেত্রে, অব্যাহত রাখছে।
সাওনি উল্লেখ করেন, ভারত সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ বছরের প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে ভারতকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে বেঁধে ফেলেছে। পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত ভূমিকার দিক থেকে ভারত এখন নিশ্চিতভাবে আমেরিকার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, রাশিয়ার প্রতি নয়।
তবে ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্ব ভারতের হাতে আসছে, তাই রাশিয়া ও চীন উভয়ের সঙ্গেই গঠনমূলক সম্পর্ক প্রয়োজন।
সাওনি বলেন, রাশিয়া এখনও নির্ভরযোগ্য অংশীদার। ২০২৬ সালে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক কিছুটা শীতল থাকতে পারে, কিন্তু আমেরিকার প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি অটুট থাকবে। একই সঙ্গে রাশিয়াও চায় এই সম্পর্ক সমৃদ্ধ হোক। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
সুমন/