গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধে নয়াদিল্লি আকাশে স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, যা চার দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতি করতে বাধ্য করেছিল বলে সুইসভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক তাদের এক গবেষণায় দাবি করেছে।
সুইজারল্যান্ডের ‘সেন্টার ফর মিলিটারি হিস্ট্রি অ্যান্ড পারসপেক্টিভ স্টাডিজ’ কর্তৃক প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত বছরের মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ দক্ষিণ এশিয়ায় আকাশপথের শক্তিসাম্যের ক্ষেত্রে এক চূড়ান্ত পরিবর্তন এনেছে।
ওই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সামরিক ইতিহাসবিদ আদ্রিয়েন ফনটানেলাজ। গত ৭ থেকে ১০ মে ২০২৫ পর্যন্ত চলা ৮৮ ঘণ্টার ভারত-পাকিস্তান বিমান যুদ্ধের অন্যতম বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ পুনর্গঠন হিসেবে এই প্রতিবেদনটিকে দেখা হচ্ছে।
তৎকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো যুদ্ধের শুরুর রাতে অন্তত একটি ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাকে প্রাধান্য দিলেও, সুইস বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, এই একটি ঘটনা আসলে বৃহত্তর কৌশলগত ফলাফলকে আড়াল করেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ও হামলা চালানোর সক্ষমতাকে ভেঙে দিয়েছিল এবং যুদ্ধটি ভারতের নিজস্ব শর্তেই শেষ হয়েছিল।
জম্মু ও কাশ্মীরের পাহালগামে পর্যটকদের ওপর এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে অভিযান শুরু করে। নয়াদিল্লি এই হামলার পেছনে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সংশ্লিষ্টতার দাবি করে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সশস্ত্র বাহিনীকে প্রতিক্রিয়া জানানোর পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকানো যায়- এমনকি এতে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি থাকলেও তারা পিছু হটেনি।
২০২৫ সালের ৭ মে ভোরে ভারতীয় বিমানবাহিনী জইশ-ই-মোহাম্মদ এবং লস্কর-ই-তৈয়বার মতো সংগঠনগুলোর প্রধান কার্যালয় এবং প্রধান প্রশিক্ষণ ক্যাম্পসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুর ও মুরিদক- এই দুটি প্রধান কেন্দ্র লক্ষ্য করে দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। হামলার পরবর্তী মূল্যায়নে দেখা যায়, বেশ কিছু ভবন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগের ভারতীয় পদক্ষেপগুলোর তুলনায় এই হামলা ছিল আরও বিস্তৃত, উন্নত এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত।
পাকিস্তানের বিমানবাহিনী আকাশপথে এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রথম রাতেই কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় আকাশযুদ্ধ দেখা যায়, যেখানে ভারতের প্রায় ৬০টি এবং পাকিস্তানের ৪০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। চীনের সরবরাহ করা দূরপাল্লার পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত রাডার ব্যবস্থার সাহায্যে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমানবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে ছিল অন্তত একটি রাফাল, একটি মিরাজ ২০০০ এবং আরেকটি যুদ্ধবিমান ধ্বংশ।
তবে প্রতিবেদনের মূল যুক্তি হলো, প্রাথমিক এই সংঘর্ষ অভিযানের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি। বরং এটি ভারতের পক্ষ থেকে এক দ্রুত ও অত্যন্ত শক্তিশালী পাল্টাহামলা শুরু করার পথ করে দেয়। পরবর্তী দিনগুলোতে ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দেয়।
স্কাল্প-ইজি এবং ব্রাহ্মোস-এর মতো স্ট্যান্ড-অফ ক্রুজ মিসাইলের সমন্বয়ে ভারতীয় বাহিনী পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানের সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল নেটওয়ার্ক এবং রাডার কভারেজ অকেজো করে দেয়।
একবার এই প্রতিরক্ষা ঢাল দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর, ভারত পাকিস্তানের প্রধান বিমানঘাঁটিগুলোতে একের পর এক শক্তিশালী হামলা চালায়। নির্ভুল লক্ষ্যভেদী এবং দূরপাল্লার অস্ত্রের মাধ্যমে রানওয়ে, অবকাঠামো এবং সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানা হয়, যা পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়।
সুইস গবেষণায় ভারতের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল আর্কিটেকচারের বিশেষ করে IACCCS নেটওয়ার্ক এবং সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে। আকাশ, বারাক-৮ এবং এস-৪০০-এর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাকিস্তানের হামলাকে ব্যর্থ করে দেয়। প্রতিবেদনের ভাষায় এটি ছিল যুদ্ধের অন্যতম একটি বিস্ময়কর সাফল্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ মে নাগাদ যুদ্ধের পাল্লা স্পষ্টতই ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিমানঘাঁটিগুলোর ওপর ক্রমাগত চাপ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পাকিস্তান আর কার্যকরভাবে আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। ভারত কার্যত আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করায় যুদ্ধের গতি ও পরিধি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা লাভ করে। সুইস বিশ্লেষকদের মতে, ঠিক এই মুহূর্তেই ইসলামাবাদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়।
তাৎক্ষণিক সামরিক ফলাফলের বাইরে, প্রতিবেদনটি যুক্তি দেয় যে ‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতের কৌশলগত তত্ত্বে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। নয়াদিল্লি এখন এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে পাকিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলাকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হবে না। সূত্র: এনডিটিভি
সুমন/