তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা গত মাসে ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-কে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নিরাপত্তা জোরদারে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে এই অনুরোধ করা হয়েছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচজন ব্যক্তি জানিয়েছেন। খবর রয়টার্সের।
এই অনুরোধ থেকে বোঝা যায়, বিদেশি মিত্ররা এখনো সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনার ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা করা দেশটিকে স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগী রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার ১৫ মাস পরও সিরিয়া অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মিত্র দেশগুলোর মতে, শারাকে ক্ষমতায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৪ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের ফলে লাখো মানুষ শরণার্থী হয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে এবং সেই অস্থিরতার সুযোগে ইসলামিক স্টেট সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করেছিল। তাদের আশঙ্কা, শারা না থাকলে আবার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত মাসে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সিরিয়াজুড়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা বাড়িয়ে দেয় এবং সাবেক বিদ্রোহী নেতা শারাকে তাদের ‘এক নম্বর শত্রু’ ঘোষণা করে।
তবে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি (MIT) ঠিক কী ধরনের সহায়তা এমআই৬ (MI-6)-এর কাছে চেয়েছে বা ব্রিটিশ সংস্থাটি নতুন কোনো দায়িত্ব নিয়েছে কি না—তা স্পষ্ট নয়।
আইএস নিয়ে সিরিয়ায় উদ্বেগ বৃদ্ধি
গত বছর তুরস্ক, ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্র শারাকে সমর্থন দেয়, যাতে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষের দেশ সিরিয়াকে আবার একত্রিত করে পুনর্গঠন করা যায়। লন্ডন ও ওয়াশিংটন সিরিয়ার ওপর আরোপিত অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে এবং শারার নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর ওপর থেকেও অনেক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।
এমআইটি, তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ব্রিটেনের ফরেন অফিস এবং সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কোনোটিই এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
সূত্রগুলোর মধ্যে সিরীয় ও বিদেশি কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তারা সবাই ইসলামিক স্টেটের শারাকে হত্যার একাধিক পরিকল্পনার খবর নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছেন।
তুরস্কের একটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারকে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এমআইটি গত মাসে এমন একটি ঘটনার পর এমআই৬-এর কাছে বাড়তি সহায়তা চেয়েছে। সিরিয়ার এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ একটি হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্র’ সামনে আসার পরই এই অনুরোধ করা হয়। তিনি জানান, এমআইটি, এমআই৬ এবং সিরীয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করছে।
তবে ওই ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত জানা যায়নি।
পশ্চিমা এক গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, তুরস্ক চায় দামেস্কে পশ্চিমা উপস্থিতি বাড়ুক, যাতে বর্তমানে তীব্র বিরোধে থাকা তুরস্ক ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য বা বাফার তৈরি করা যায়।
শারাকে হত্যার একাধিক প্রচেষ্টা
জাতিসংঘের কাউন্টার-টেররিজম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শারাসহ তার মন্ত্রিসভার দুই জ্যেষ্ঠ সদস্যকে লক্ষ্য করে পাঁচটি হত্যাচেষ্টা চালায় আইএস, যদিও সেগুলো ব্যর্থ হয়। গত নভেম্বরে রয়টার্স জানিয়েছিল, সিরীয় কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে দুটি পরিকল্পনা নস্যাৎ করে।
শারাকে বৈশ্বিক ইসলামিক স্টেটবিরোধী জোটের ‘প্রহরী’ আখ্যা দিয়ে সংগঠনটি গত মাসে সিরীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছয়টি হামলা চালায়, যাকে তারা ‘নতুন ধাপ’ বলে উল্লেখ করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো দামেস্ক প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে তারা এমআইটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তারা জানায়, রাজধানীতে ইসলামিক স্টেটের একটি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে দুই পক্ষ যৌথভাবে কাজ করেছে।
তুর্কি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, এমআইটি তিন সদস্যের একটি দলকে শনাক্ত করেছিল যারা দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর ফলে সিরীয় কর্তৃপক্ষ “তাৎক্ষণিক হামলা” ঠেকাতে সক্ষম হয়।
এ বিষয়ে অবগত এক মার্কিন কূটনীতিক বলেছেন, ইসলামিক স্টেটের পুনরুত্থানের কারণেই এমআইটি এমআই৬-এর কাছে সহায়তার অনুরোধ জানিয়েছে।
পশ্চিমা ওই গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দুই সংস্থা যৌথ পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রম আরও জোরদার করতে পারে। তবে দামেস্কে ব্রিটিশ কর্মী পাঠানো হবে কি না—সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শারা ২০১৬ সালে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে সিরিয়ায় আল-কায়েদার শাখা নুসরা ফ্রন্ট-এর কমান্ডার ছিলেন। পরে ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইসলামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
মাহফুজ/