লেবাননের বৈরুতে সমুদ্র তীরের পাশে নিজের গাড়ির যাত্রীর আসনের দরজা খুলে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন আবু হায়দার। ছয় সপ্তাহ ধরে যে গদিতে ঘুমিয়েছেন, সেটি ভাঁজ করে গাড়ির ওপর তুলে রেখেছেন।
হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক ঘণ্টা বাকি। তার গাড়ি প্রস্তুত, তিনি দক্ষিণ সীমান্ত থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের নিজের গ্রাম খেরবেত সেলেমে ফিরতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি রাত ১১টাতেই রওনা দেব, ১২টায় না।’ আবু হায়দার জানান, ইসরায়েল সেদিন দক্ষিণে যাওয়ার শেষ কার্যকর সেতুটি বোমা মেরে ধ্বংস করলেও তিনি কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেবেন।
তবে অন্যদের অনেকেই তার মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বৈরুত শহরের কেন্দ্রস্থলে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষজন বলছেন, তারা ইসরায়েলের ওপর ভরসা করতে পারছেন না এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন। আর অনেকেরই তো ফিরতে যাওয়ার মতো ঘরবাড়িই নেই।
বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরের হাই এল-সেলোম এলাকায় ফাদাল আলাউইর বাড়ির একটি ঘর ছাড়া সবই ধ্বংস হয়ে গেছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাইথাম দানদাশ ও তার স্ত্রী রুয়াইদা জাইতার। তাদের বাড়ি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দানদাশ বলেন, ‘আমরা পুরো ১০ দিন এখানেই থাকব।’
তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি না হলে তারা বাড়ি ফিরবেন না। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর ভোরে যখন এক বছরের যুদ্ধের পর আগের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তখন পরিস্থিতি ছিল একেবারে ভিন্ন। মানুষ আনন্দে ঘরে ফেরার জন্য গাড়িতে জিনিসপত্র তুলেছিল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো খালি হয়ে যায়। সড়কগুলো ভরে যায় দক্ষিণ ও বৈরুতের উপশহরের দিকে রওনা হওয়া গাড়ির ভিড়ে।
কিন্তু এবার সেই আনন্দ নেই। সমুদ্র তীরের কাছে থাকা বাস্তুচ্যুত মানুষরা বলছেন, খুব কম মানুষই এবার ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছে। কেউ কেউ সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখবেন যুদ্ধবিরতি টিকে কি না, তারপর বাড়ির অবস্থা দেখতে যাবেন। আবার দক্ষিণ লেবাননের মাইফাদুন এলাকার টুকটুক চালক আলী জাবেরের মতো অনেকে মনে করছেন, ইসরায়েল সড়কে চলাচলরত গাড়িতেও হামলা চালাতে পারে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে কথা বলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, পূর্বাঞ্চলীয় সময় বিকেল ৫টা (বৈরুত সময় মধ্যরাত) থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। মার্চের শুরুতে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অভিযান শুরু করার পর ছয় সপ্তাহ ধরে তীব্র লড়াই চলছিল।
দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল শহর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতির আগেই ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালিয়েছে এবং পুরো গ্রাম ধ্বংস করার ভিডিওও প্রকাশ করেছে। ওই শহরে ২০০০ সালে ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসানের পর হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন।
কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও লেবাননের সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার পর এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে। বিষয়টি লেবাননের জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ এসব আলোচনার বিরোধিতা করছে এবং সরকারের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
আবু হায়দারের পাশে বসা আবু হুসেইন বলেন, ‘আমরা প্রতিরোধের কারণে ঘরে ফিরছি।’ হিজবুল্লাহকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের কারণে নয়।’ যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো এখনো পরিষ্কার নয়, যা মানুষের সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে তার সেনারা দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে আসবে না। জবাবে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি মানে পুরো লেবাননে হামলা বন্ধ হতে হবে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর চলাচলের স্বাধীনতা থাকা যাবে না। যদি ইসরায়েল দখল বজায় রাখে, তাহলে তারা প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখবে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই হিজবুল্লাহ এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র, পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির নেতৃত্বাধীন আমাল মুভমেন্ট তাদের সমর্থকদের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে না ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা