ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে টানটান উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। আজ সোমবার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভাগ্য নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস কি চতুর্থবারের মতো নবান্ন দখল করবে, নাকি গেরুয়া ঝড় তুলে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসবে বিজেপি? দিল্লির বিশ্লেষক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার—সবার নজর এখন গণনার টেবিলের দিকে। একদিকে বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাসে বিজেপির পাল্লা ভারী, অন্যদিকে ২০২১-এর মতো চমক দেখিয়ে জয় ধরে রাখতে আত্মবিশ্বাসী মমতা। এই ফলাফল ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হচ্ছে আজ সকাল ৮টা থেকে। একটি আসনে অনিয়মের অভিযোগে পুনরায় ভোট হবে। ফলে ২৯৩টি আসনের ফলাফল ঘোষিত হবে আজ।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথমে শুরু হবে পোস্টাল ব্যালট গণনা। এরপর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ফলাফল আসা শুরু করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকেলের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার কার হাতে থাকছে। তবে ফালটা আসনের ভোট স্থগিত হওয়ায় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮-এর লড়াইয়ে প্রতিটি আসন এখন গুরুত্বপূর্ণ।
বিজেপির ‘মর্যাদার লড়াই’
বিজেপির জন্য এবারের পশ্চিমবঙ্গ দখল কেবল একটি রাজ্যের জয় নয়, বরং এটি তাদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে বিজেপি তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। অধিকাংশ বুথফেরত জরিপ এবার বিজেপিকে এগিয়ে রেখেছে। যদি এসব জরিপ সত্যি হয়, তবে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতা দখল করবে। বিশ্লেষকদের মতে, সিএএ, অনুপ্রবেশ ইস্যু এবং হিন্দু ভোটারদের মেরুকরণ বিজেপির প্রধান হাতিয়ার ছিল।
তৃণমূলের পাল্টা চ্যালেঞ্জ ও মমতার আত্মবিশ্বাস
অন্যদিকে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুথফেরত জরিপকে ‘পেইড নিউজ’ বা অর্থের বিনিময়ে করা প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, রাজ্যের গ্রামীণ ভোট এবং নারীদের জন্য চালু করা সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর সুফল তৃণমূলকে আবারও ক্ষমতায় ফেরাবে। তৃণমূল নেতৃত্বের মতে, গত এক দশকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার বিপরীতে তারা ‘বাঙালি অস্মিতা’ বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদকে সফলভাবে তুলে ধরতে পেরেছে।
দিল্লির নজর কেন কেবল বাংলায়
ভারতের অন্যান্য রাজ্য যেমন–কেরালা, তামিলনাড়ু বা আসামে নির্বাচন হলেও দিল্লির মূল নজর এখন পশ্চিমবঙ্গে। এর প্রধান কারণ, বিজেপি দক্ষিণ ভারতে এখনও মূল শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু বাংলায় জয় পেলে তা হবে ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিজেপির একচ্ছত্র আধিপত্যের চূড়ান্ত ধাপ। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অপূর্বানন্দের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, করপোরেট সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন—সবাই যেন বাংলায় পরিবর্তন দেখার জন্য মুখিয়ে আছে।
একসময়কার অপরাজেয় বাম ফ্রন্ট এবং জাতীয় দল কংগ্রেস এখন পশ্চিমবঙ্গে প্রায় অস্তিত্বহীন। তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থাকলেও বিজেপি ছাড়া আর কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেই। এই রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়েই বিজেপি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের দুর্নীতি ও স্থানীয় নেতাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষ বিকল্প খুঁজছে, যা বিজেপির ভোট ব্যাংকে জোয়ার এনেছে।
এসআইআর বিতর্ক ও ভোটার বিয়োগ
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর। প্রায় ৯০ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার একটি বড় অংশই সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়। তৃণমূলের অভিযোগ, এটি নির্বাচন কমিশনের একটি সাজানো পরিকল্পনা। বিজেপির জয় যদি খুব সামান্য ব্যবধানে হয়, তবে এই বিতর্ক ভারতীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে।
আজকের ফলাফল শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, বরং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজনীতির গতিপথ ঠিক করে দেবে। যদি মমতা জয়ী হন, তবে তিনি বিজেপিবিরোধী জোটের প্রধান মুখ হয়ে উঠবেন। আর যদি গেরুয়া শিবিরের জয় হয়, তবে তা হবে ভারতীয় রাজনীতির এক অভাবনীয় মোড়। নবান্নের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার হাসি চওড়া হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।