লাল গ্রহ মঙ্গলে ভবিষ্যতের অভিযানের জন্য জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। রুক্ষ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম নতুন প্রজন্মের ড্রোন ও রোবট তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বুকে খুঁজে নিয়েছেন মঙ্গলের মতো পরিবেশ। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক ও মোহাভি মরুভূমির ধু-ধু বালিয়াড়িতে চলছে নাসার অত্যাধুনিক সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির (জেপিএল) প্রকৌশলীরা সম্প্রতি তিনটি গবেষণাধর্মী ড্রোন নিয়ে ডেথ ভ্যালিতে যান। তাদের মূল লক্ষ্য এমন একটি নেভিগেশন বা দিক নির্ণয় সফটওয়্যার তৈরি করা, যা বৈশিষ্ট্যহীন ও একঘেয়ে মরুভূমিতেও পথ না হারিয়ে উড়তে পারে। এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক্সটেন্ডেড রোবাস্ট এরিয়াল অটোনমি’। চলতি বছর মঙ্গলের জন্য নাসা যে ২৫টি নতুন প্রযুক্তিতে অর্থায়ন করেছে, এটি তার অন্যতম।
কেন এই পরীক্ষা?
মঙ্গলের বালিয়াড়ি বা ধু-ধু প্রান্তর ড্রোন বা হেলিকপ্টারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। নাসার মঙ্গল হেলিকপ্টার ‘ইনজেনুইটি’ তার শেষ কয়েকটি ফ্লাইটের সময় এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। মঙ্গলের বৈশিষ্ট্যহীন ভূখণ্ডে ইনজেনুইটির নেভিগেশন অ্যালগোরিদম বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল।
জেপিএলের গবেষক ও ড্রোন পাইলট রোল্যান্ড ব্রকার্স বলেন, ‘ইনজেনুইটিকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যা মাটির বিভিন্ন দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য দেখে নিজের গতিপথ ঠিক করত। কিন্তু যখন এটি বৈশিষ্ট্যহীন সমতল এলাকার ওপর দিয়ে উড়েছিল, তখন দিক ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই, ভবিষ্যতের যানগুলো আরও বহুমুখী হোক এবং বালিয়াড়ির মতো কঠিন এলাকাতেও যেন কোনো সমস্যা ছাড়া উড়তে পারে।’
মঙ্গলের প্রতিচ্ছবি ডেথ ভ্যালি
১৯৭০-এর দশক থেকে নাসার বিজ্ঞানীদের কাছে ডেথ ভ্যালি একটি জনপ্রিয় গবেষণাক্ষেত্র। ভাইকিং মহাকাশযান মঙ্গলে পাঠানোর আগেও এখানে পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। এখানকার রুক্ষ আগ্নেয় শিলা ও পাথুরে ঢাল অনেকটা মঙ্গলের মতো। তাই এই এলাকার নামই হয়ে গেছে ‘মার্স হিল’ বা মঙ্গলের পাহাড়।
এপ্রিলের শেষ এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে জেপিএল দল ডেথ ভ্যালির মেসকুইট ফ্ল্যাট স্যান্ড ডিউনস এলাকায় ড্রোনের পরীক্ষা চালায়। সে সময় সেখানকার তাপমাত্রা ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। অসহনীয় গরমেও ল্যাপটপ নিয়ে তাঁবুর নিচে বসে ড্রোনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
এই পরীক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, বিভিন্ন ক্যামেরা ফিল্টার ব্যবহার করে কীভাবে মাটি পর্যবেক্ষণ করা যায়। এ ছাড়া নতুন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে কীভাবে পাথুরে জমিতে নিরাপদে ড্রোন অবতরণ করানো যায়, সে বিষয়ে ধারণা পেয়েছেন প্রকৌশলীরা। ডেথ ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের সুপারিনটেনডেন্ট মাইক রেনল্ডস বলেন, ‘মহাকাশ অভিযানের জন্য ডেথ ভ্যালিকে পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা সত্যিই রোমাঞ্চকর। এটি প্রমাণ করে যে, এই পার্ক শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সংরক্ষিত নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত ল্যাবরেটরি, যা আমাদের ভিনগ্রহ সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।’
যান্ত্রিক কুকুর ‘ল্যাসি-এম’
শুধু আকাশপথে নয়, মঙ্গলের কঠিন মাটিতে চলার জন্যও রোবট তৈরি করছে নাসা। গত আগস্টে হিউস্টনের জনসন স্পেস সেন্টারের গবেষকরা নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে একটি যান্ত্রিক কুকুর নিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। এই চারপেয়ে রোবটটির নাম ‘ল্যাসি-এম’।
রোবটটির পায়ে বিশেষ মোটর বসানো আছে, যা মাটির ধরন বুঝতে পারে। মাটি নরম, আলগা নাকি শক্ত, তা বুঝে রোবটটি নিজের হাঁটার ভঙ্গি পরিবর্তন করতে সক্ষম। গবেষকদের লক্ষ্য এমন একটি রোবট তৈরি করা, যা মানুষ বা বড় রোভারের আগে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
ডানাওয়ালা রোবট ‘মার্ফ’
ইনজেনুইটি হেলিকপ্টারের সাফল্যের পর এবার ডানাযুক্ত রোবট নিয়ে কাজ করছে নাসা। ভার্জিনিয়ার ল্যাংলি রিসার্চ সেন্টারে তৈরি হচ্ছে ‘মার্স ইলেকট্রিক রিইউজেবল ফ্লায়ার’ বা ‘মার্ফ’। এটি দেখতে অনেকটা একটি একক ডানার মতো, যার দুই প্রান্তে প্রপেলার রয়েছে। এটি হেলিকপ্টারের মতো খাড়াভাবে ওপরে উঠতে এবং বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।
পূর্ণ আকারের মার্ফ একটি ছোট স্কুল বাসের সমান লম্বা হবে। তবে বর্তমানে এর একটি ছোট সংস্করণ পরীক্ষা করা হচ্ছে। হালকা উপাদান দিয়ে তৈরি এই রোবট মঙ্গলের পাতলা বায়ুমণ্ডলে দ্রুতগতিতে উড়তে পারবে এবং ওপর থেকে মাটির মানচিত্র তৈরি করতে পারবে।
নাসার মঙ্গল এক্সপ্লোরেশন প্রোগ্রামের আওতায় এই প্রযুক্তিগুলো আগামী দিনে লাল গ্রহে মানুষের অভিযানের পথ সুগম করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই রোবটগুলো নভোচারীদের সহকারী হিসেবে কাজ করবে এবং মঙ্গলের অজানা রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


