যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার অ্যালকর সেন্টারের ক্রায়োজেনিক চেম্বারে দেড় শতাধিক মানুষের বিচ্ছিন্ন মাথা হিমায়িত করে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির মাধ্যমে এই মগজগুলোকে নতুন শরীরে জীবিত করার আশায় এমনটি করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, বর্তমান আধুনিক যুগে তাজা থাকতেই কেন এই মাথাগুলো অন্য শরীরে জুড়ে দেওয়া যাচ্ছে না? চিকিৎসাবিজ্ঞান এত উন্নত হলেও ব্রেইন প্রতিস্থাপন কেন এখনো অসম্ভব?
উইস্কনসিন মেডিকেল কলেজের নিউরো সার্জারির সহকারী অধ্যাপক ড. ম্যাক্স ক্রুকফ এটিকে ব্রেইন প্রতিস্থাপনের চেয়ে ‘শরীর প্রতিস্থাপন’ বলতে বেশি পছন্দ করেন। তিনি জানান, হৃদযন্ত্র বা লিভার প্রতিস্থাপনের চেয়ে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষের বুদ্ধি, চেতনা ও ব্যক্তিত্ব ব্রেইনের ভেতরে থাকে। তাই অন্য শরীরে ব্রেইন প্রতিস্থাপন করলে ব্যক্তিটি সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষে রূপান্তরিত হবেন।
ম্যাক্স ক্রুকফ বলেন, ব্রেইন ও মেরুদণ্ড নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের স্নায়ুগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করা এখন পর্যন্ত অসম্ভব। মানুষের শরীরের অন্যান্য স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা নিজে থেকে পুনর্গঠিত হতে পারে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে নতুন নিউরন বা স্নায়ুকোষ তৈরির প্রমাণ খুব সীমিত। মানুষের শেখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্নায়ুগুলো নতুন সংযোগ তৈরি করে ঠিকই, তবে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃত্রিমভাবে এই সংযোগ তৈরির পথ এখনো বিজ্ঞানীদের অজানা।
ব্রেইনের আংশিক প্রতিস্থাপনও বর্তমানে অসম্ভব। যেমন ব্রেইনের পেছনের অংশ বা সেরিবেলামে কোটি কোটি বিশেষায়িত ‘পুরকিনজি কোষ’ থাকে। এই কোষগুলোর একটির সঙ্গে অন্য হাজারো নিউরনের জটিল যোগাযোগ থাকে। স্নায়ুর এই বিপুল সংযোগ সামলানো মানুষের বর্তমান চিকিৎসা সক্ষমতার বাইরে।
তাত্ত্বিকভাবে মেরুদণ্ডের মাধ্যমে ব্রেইন ও শরীর জুড়ে দেওয়া সবচেয়ে সহজ মনে হতে পারে। কারণ ঘাড়ের চামড়া, পেশি, রক্তনালি ও হাড় সংযুক্ত করার পাশাপাশি মেরুদণ্ডের স্নায়ুগুলোকে সারিবদ্ধ করা সম্ভব। তবে অস্ত্রোপচারের পর সেই স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ চালু করার পদ্ধতি এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের জানা নেই।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রক্তনালি সেলাইয়ের নতুন প্রযুক্তি আসার পর প্রাণীদের ওপর প্রথম মাথা প্রতিস্থাপনের পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রত্যাখ্যানের কারণে সেই কুকুর বা বানরগুলো সর্বোচ্চ কয়েক দিন বেঁচে ছিল। ১৯৭০ সালে ড. রবার্ট জে হোয়াইট বানরের মাথা অন্য শরীরে প্রতিস্থাপন করেন। অস্ত্রোপচারের পর বানরটি খাবার চিবাতে পারলেও মাত্র ৯ দিন জীবিত ছিল।
এই পরীক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১৩ সালে ইতালীয় সার্জন ড. সার্জিও কানাভেরো মানুষের মাথা প্রতিস্থাপনের পরিকল্পনা করেন। তবে নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক কারণে অন্য চিকিৎসকরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ২০১৭ সালে কানাভেরো একটি লাশে মাথা প্রতিস্থাপনের দাবি করলে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির নীতিবিদ আর্থার ক্যাপলান এটিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দেন।
পুরো ব্রেইন প্রতিস্থাপন করা না গেলেও স্টেম সেল বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম টিস্যু ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্রেইনের চিকিৎসা হয়তো ভবিষ্যতে সম্ভব হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সহকারী অধ্যাপক রুসলান রাস্ট বলেন, পূর্ণাঙ্গ নিউরনের চেয়ে স্টেম সেল ব্রেইনের বর্তমান স্নায়ু কাঠামোর সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
পারকিনসনস, স্ট্রোক ও মেরুদণ্ডের আঘাতের চিকিৎসায় স্টেম সেল নিয়ে পরীক্ষা চলছে। তবে আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এখনো বাণিজ্যিকভাবে এর অনুমোদন দেয়নি। কারণ স্টেম সেল থেকে ব্রেইনের টিউমার হওয়ার বা স্বাভাবিক স্নায়ু যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ল্যাবরেটরিতে তৈরি কৃত্রিম অঙ্গ বা অর্গানয়েড ব্যবহার করে ২০২৩ সালে ইঁদুরের ব্রেইনের ক্ষত সারানো সম্ভব হলেও মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার পেতে আরও বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স


