এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের এক শুক্রবারের সন্ধ্যা। নিউ ইয়র্ক সিটির বিখ্যাত কার্নেগি হলের মঞ্চে পিয়ানো বাজাচ্ছেন ‘বায়োটেক বার্বি’ নামে পরিচিত কানাডিয়ান উদ্যোক্তা ক্যাথি টাই। ঝলমলে গাউন পরিহিত ক্যাথির আঙুলগুলো পিয়ানোর কি-বোর্ডে দ্রুত নড়াচড়া করছিল। কিন্তু তার মুখে কোনো আবেগের প্রকাশ ছিল না, চোখ দুটো ছিল কেবল নোটবুকের পাতায়।
উপস্থাপনা শেষ হতেই পুরো মিলনায়তন জুড়ে করতালি আর জন্মদিনের শুভেচ্ছার গান ভেসে আসে। তবে জমকালো এই আয়োজনে উপস্থিত অধিকাংশ অতিথিই তাকে ভালো করে চেনেন না। আয়োজনটি ছিল ক্যাথি টাইয়ের ৩০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান। কিন্তু এই আয়োজনের আড়ালে রয়েছে এক বিতর্কিত বৈজ্ঞানিক মিশন—মানব ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করে রোগমুক্ত শিশু তৈরি।
ক্যাথি টাই সব সময়ই বড় কোনো প্রভাব তৈরি করতে পছন্দ করেন, তবে তাকে সহজে ধরাছোঁয়া যায় না। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি তিনটি আলাদা বায়োটেক কোম্পানি চালু করেছেন এবং লস অ্যাঞ্জেলেস, টরন্টো ও নিউ ইয়র্কের মতো তিনটি ভিন্ন শহরে থেকেছেন। কিছুদিন আগে তিনি বিশ্বখ্যাত চীনা বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুইকে বিয়ে করেন, যিনি বিশ্বের প্রথম জিন-পরিবর্তিত শিশু জন্ম দিয়ে তিন বছর জেল খেটেছেন। বিয়ের মাত্র তিন মাস পর তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
এরপর গত গ্রীষ্মে মাত্র একটি স্যুটকেস আর পোষা কুকুর নিয়ে ক্যাথি নিউ ইয়র্কে আসেন এবং নিজের নতুন স্টার্টআপ শুরুর ঘোষণা দেন। তার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করে সিস্টিক ফাইব্রোসিস, হান্টিংটন এবং বংশগত ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করা। তবে তার প্রাক্তন স্বামীর মতো গোপনে নয়, বরং তিনি সরকারি অনুমোদন নিয়ে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যেই এই কাজ করতে চান। এবং এর পেছনে রয়েছে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিপুল বিনিয়োগ।
মানব বিবর্তনের নতুন মোড়
২০১২ সালে ক্রিসপার প্রযুক্তি আবিষ্কারের পর থেকে মানুষের জিন পরিবর্তন বা মুছে ফেলার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু মানব প্রজনন কোষের এই জিনগত পরিবর্তন পরবর্তী প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যে স্থানান্তরিত হবে। বায়োটেকনোলজির ইতিহাসে এটি মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয়। আর এ কারণেই যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে প্রজননের উদ্দেশ্যে মানব ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ক্যাথি টাই বলেন, "এটি আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি। কারণ এটি আমাদের নিজেদের প্রজাতিকে পরিবর্তনের ক্ষমতা দেয়।" তবে এই গবেষণার জন্য কোনো সরকারি তহবিল পাওয়া যায় না। পুরো বিষয়টি বেসরকারি এবং ধনকুবেরদের বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান এবং কয়েনবেসের সিইও ব্রায়ান আর্মস্ট্রংয়ের মতো বিশ্বের ধনী ব্যক্তিরা এখন এই খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই ভ্রূণ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ‘সেরা শিশু’ বেছে নেওয়ার প্রযুক্তি বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার নিয়মিত অংশ হয়ে উঠেছে। পাতাল রেলেও বিজ্ঞাপন দিয়ে লম্বা, বুদ্ধিমান ও সুস্থ শিশু বেছে নেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। ক্যাথি টাই মনে করেন, বিজ্ঞানীদের কাজ হলো এই প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ামক সংস্থাগুলোর সামনে তুলে ধরা, যেন তারা কঠোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করেন।
চীন ও রাশিয়ার প্রতিযোগিতা
চীন ইতোমধ্যেই জিন প্রযুক্তির ক্ষমতা বিশ্বকে দেখিয়েছে। ২০১৮ সালে বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই যমজ দুই শিশু লুলু এবং নানার ভ্রূণের জিন পরিবর্তন করে তাদের জন্ম দেন। তার দাবি ছিল, এই শিশুরা যেন এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়। তবে এই বিতর্কিত পরীক্ষার জন্য তাকে বড় অঙ্কের জরিমানা ও কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।
কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, ভবিষ্যতে মানুষের বুদ্ধিমত্তা বা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরি করা অনিবার্য। এর পরপরই চীন সরকার বায়োমেডিক্যাল প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য নতুন খসড়া নীতিমালা ঘোষণা করে। এর জবাবে ক্যাথি টাই এক পোস্টে লেখেন, "জৈবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ভোরে আপনাকে স্বাগতম।" ভূ-রাজনৈতিক এই গুরুত্বের কারণেই তিনি তার প্রথম জিন-এডিটিং কোম্পানির নাম রেখেছিলেন পরমাণু বোমার প্রকল্পের নামানুসারে—‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।
ক্যাথি টাইয়ের বর্তমান স্টার্টআপ ‘অরিজিন জেনোমিক্স’ মূলত একক জিনের মিউটেশনের কারণে হওয়া মারাত্মক রোগগুলো প্রতিরোধের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের ল্যাবের কোনো ভ্রূণই জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয় না বা ১৪ দিনের বেশি বড় হতে দেওয়া হয় না।
অনেকে মনে করেন, জিন থেরাপির মাধ্যমে শিশুর জন্মের পরও এই চিকিৎসা করা সম্ভব, যার জন্য বংশগত পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় না। তবে ক্যাথি এই যুক্তির সাথে একমত নন। তার মতে, ভ্রূণ ফেলে দেওয়ার চেয়ে তার ভেতরের ছোট সমস্যাটি সংশোধন করে নেওয়া নৈতিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য।
উচ্চ মূল্য ও বৈষম্যের ঝুঁকি
এই প্রযুক্তির ব্যয় কত হবে—জানতে চাইলে ক্যাথি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানাতে পারেননি। তবে প্রারম্ভিক পর্যায়ে এই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি কেবল ধনীদের নাগালের মধ্যেই থাকবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি বড় বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
ক্যাথি টাইয়ের অতীত উদ্যোগগুলোও বেশ বিতর্কিত। এর আগে লস এঞ্জেলেসের একটি স্টার্টআপে খরগোশ বা বিড়ালের মতো প্রাণীদের জিন পরিবর্তন করে অন্ধকারে আলো জ্বলা খরগোশ, অ্যালার্জি-মুক্ত বিড়াল বা ড্রাগন তৈরি করার বাণিজ্যিক চেষ্টা চালানো হয়েছিল। তিনি ইউনিকর্ন বা কাল্পনিক ঘোড়া তৈরিতেও আগ্রহী ছিলেন।
ক্যাথি টাই ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। স্কুলে বিজ্ঞান মেলা থেকে তিনি হাজার হাজার ডলার বৃত্তি পেতেন। ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার জন্য শিক্ষিকা বকা দিলে তিনি উল্টো শিক্ষিকাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছিলেন তার কোনো প্রকাশিত পেপার আছে কিনা তা দেখার জন্য। ১৮ বছর বয়সে তিনি থিয়েল ফেলোশিপের এক লাখ ডলার অনুদান পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সরাসরি সিলিকন ভ্যালিতে ব্যবসায় নামেন। ২০১৮ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের অনূর্ধ্ব-৩০ তালিকায় তার নাম আসে।
হে জিয়ানকুইয়ের সাথে সম্পর্ক ও চীন বিতর্ক
ক্যাথির জীবনে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হলো বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুইয়ের সাথে সম্পর্ক। ২০২৫ সালের শুরুতে বেইজিংয়ে তাদের প্রেম ও বিয়ে হয়। তাদের বিয়ের আংটি দুটি ছিল ডিএনএ ডাবল হেলিক্সের আদলে তৈরি। জিয়ানকুইকে তিনি একজন সাহসী ‘ধর্মদ্রোহী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যিনি সমাজচ্যুত হওয়ার পরও নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন।
তবে বিয়ের মাত্র তিন মাস পরই তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। ক্যাথি যখন বেইজিংয়ে তার স্বামীর সাথে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছিলেন, তখন মাঝপথে ম্যানিলাতে তাকে আটকে দেওয়া হয় এবং চীনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কেন চীন সরকার তাকে নিষিদ্ধ করেছিল, তা এখনও রহস্য। এই সংকটের সময় তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন এবং একটি মেম কয়েনও চালু করা হয়েছিল, যেখানে তাঁদের দুজনের ছবি ব্যবহার করা হয়। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ক্যাথি অস্বস্তিতে পড়েন এবং কথা এড়িয়ে যান।
ইউটোপিয়া বনাম ইউজেনিক্স বিতর্ক
সম্প্রতি ম্যানহাটনে বায়োথিসিস্ট অধ্যাপক আই গ্লেন কোহেনের সাথে এক উন্মুক্ত বিতর্কে অংশ নেন ক্যাথি। সেখানে অধ্যাপক কোহেন সতর্ক করে বলেন, এই প্রযুক্তি মানব প্রজন্মের সম্মতি ছাড়াই তাদের ওপর ঝুঁকি চাপিয়ে দিচ্ছে, যা ‘ইউজেনিক্স’ বা সুপ্রজননবিদ্যার মতো সংবেদনশীল বিতর্ককে সামনে নিয়ে আসে।
জবাবে ক্যাথি বলেন, "ইউজেনিক্স একটি খুব ভারী শব্দ। আমি এই শব্দটির যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধ করতে চাই।"
বিতর্ক শেষে ক্যাথি দাবি করেন, মানুষের মনোভাব দ্রুত পাল্টাচ্ছে এবং এই প্রযুক্তি একদিন বৈধতা পাবেই। তবে ম্যানহাটন প্রজেক্ট বা হে জিয়ানকুইয়ের মতো বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর ছায়া থেকে তিনি নিজেকে কতটা মুক্ত করতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


