জার্মানির এক গুহায় পাওয়া ৪০ হাজার বছরের পুরোনো কিছু নিদর্শন আদিম মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। ১৯৭৯ সালে আবিষ্কৃত ‘অ্যাডোরেন্ট ফিগারিন’ নামক একটি হাতির দাঁতের মূর্তিতে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন ও বিন্দুর সারি দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, এই চিহ্নগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ বর্ণমালা না হলেও এগুলো পরবর্তী সময়ের লিখন পদ্ধতির প্রাথমিক রূপ হতে পারে।
নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই চিহ্নগুলোর বৈশিষ্ট্য খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায় গড়ে ওঠা আদিম লিপির সঙ্গে মিলে যায়। মেসোপটেমিয়ার সেই লিপি থেকেই বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখন পদ্ধতি ‘কিউনিফর্ম’ বা অক্ষরলিপির উদ্ভব হয়েছিল।
জার্মানির সারল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ভাষাবিদ ক্রিশ্চিয়ান বেনজ এবং তার দল এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা পাথরযুগের ২০০টিরও বেশি নিদর্শনের ওপর গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ চালিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আদিম মানুষ এই চিহ্নগুলো শুধু সাজসজ্জার জন্য ব্যবহার করেনি। এই চিহ্নগুলোর প্রয়োগ ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত।
গবেষকরা লক্ষ করেছেন, নিদর্শনে থাকা বিভিন্ন ধরনের খাঁজ, বিন্দু, রেখা ও যোগ চিহ্নের ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলত। যেমন–যোগ চিহ্নগুলো কেবল শিকারের সরঞ্জাম ও পশুর মূর্তিতে পাওয়া গেছে, তবে মানুষের মূর্তিতে এমন চিহ্ন দেখা যায়নি। এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয় যে, নির্দিষ্ট চিহ্নের মাধ্যমে তারা বিশেষ কোনো তথ্য প্রকাশ করত। এই নিয়ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসত।
বিজ্ঞানীরা এই চিহ্নগুলোর ‘ইনফরমেশন ডেনসিটি’ বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখেছেন, মেসোপটেমিয়ার উরুক শহরের প্রাচীন ‘প্রোটো-কিউনিফর্ম’ লিপিতে তথ্যের বিন্যাস যেভাবে থাকত, এই ৪০ হাজার বছরের পুরোনো চিহ্নের বিন্যাসও অনেকটা সেরকম। তবে বর্তমানের আধুনিক লিখন পদ্ধতির সঙ্গে এর কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে এই চিহ্নগুলোর সঙ্গে সমকালীন মৌখিক ভাষার কোনো সরাসরি সংযোগ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বার্লিনের মিউজিয়াম অব প্রিহিস্টরি অ্যান্ড আর্লি হিস্টরির প্রত্নতাত্ত্বিক ইভা ডুটকিউইচ বলেন, ৪০ হাজার বছর আগের হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের ভাষা বর্তমানের মতো কাঠামোগতভাবে উন্নত ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই গবেষণা প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। যদিও এই চিহ্নগুলোর অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি মানুষের লিখন পদ্ধতির উৎপত্তির ইতিহাস বুঝতে বড় সহায়ক হবে।


