দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহসহ তিন সদস্যের কমিশন পদত্যাগ করেছে। অপর দুই সদস্য হলেন দুদক কমিশনার জহুরুল হক ও আছিয়া খাতুন।
মঙ্গলবার (২৯ অক্টোবর) তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। দুদকের মুখপাত্র ও মহাপরিচালক আক্তার হোসেন খবরের কাগজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন।
কমিশনের এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আপাতত বন্ধ হলো সংস্থাটির দুর্নীতি দমন কার্যক্রম। কমিশন পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটি কারও বিরুদ্ধে কোনো রকম আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
দুদকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী ‘কমিশনের সকল সিদ্ধান্ত উহার সভায় গৃহীত হইতে হইবে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই আইনে কমিশন বলতে তিন সদস্যের কমিশন, যা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তিন কমিশনার ও এর মধ্যে একজন চেয়ারম্যান নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। শুধু কমিশনের সভায় দুদকের সব কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সুপারিশ, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন হওয়া বাধ্যতামূলক। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কমিশনবিহীন দুদকের তৎকালীন সচিবের স্বাক্ষরে অনুমোদন হওয়া ৫৬টি মামলা বাতিল করেন হাইকোর্ট। অবশ্য হাইকোর্টের রায়ের পর সেই মামলাগুলোকে কমিশনের সভায় ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, যদিও আইন অনুযায়ী ‘এক মাসের নোটিশ দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠানোর বিধান রয়েছে এবং পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন মনে করলে পদত্যাকারী চেয়ারম্যান বা কমিশনারকে দায়িত্ব পালনের অনুরোধ করতে পারবেন।’ কিন্তু এ ক্ষেত্রে তেমনটা হচ্ছে না। কারণ দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা সরাসরি পদত্যাগ করেছেন। তাই নোটিশ পিরিয়ড (১ মাস) তারা দায়িত্ব পালন করবেন, এমন কোনো ধারণাও পাওয়া যাচ্ছে না।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১ সালের ১০ মার্চ ৫ বছরের মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যন হিসেবে নিযুক্ত হন মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ। একই দিন কমিশনার নিযুক্ত হন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ জহুরুল হক। আরেক কমিশনার আছিয়া খাতুন দুদকে যোগদান করেন ২০২৩ সালে ২ জুলাই। গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর তাদের পদত্যাগ দাবি করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। এর পরেও তারা দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং বিগত সরকারের প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী, এমপি, সরকারি আমলা ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে শতাধিক অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের এ ধরনের কার্যক্রম জোরদারের শুরু হলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দাবি উত্থাপনের প্রায় আড়াই মাস পর গতকাল তারা পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পর দুপুরে দুদক চেয়ারম্যান ও অপর দুই কমিশনার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তার কাছে বিদায় নেন।
এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশনের সঙ্গে গতকাল বেলা ৩টায় দুদক চেয়ারম্যান, কমিশনারদ্বয় ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতবিনিময় সভা নির্ধারিত ছিল। এর আগেই দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা পদত্যাগ করায় মতবিনিময় সভাটি বাতিল করে সংস্কার কমিশন। এ ব্যাপারে টিআইবির পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, দুদব চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের খবর পেয়ে পূর্বনির্ধারিত মতবিনিময় সভাটি বাতিল করা হয়েছে।