ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের সব মহানগর, আন্তজেলা, স্বল্প ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ৪০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি তুলেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সাপেক্ষে বাসের নানা যন্ত্রাংশেরও দাম বেড়েছে, এমন দাবিতে বাস ভাড়া বাড়ানোর জন্য নানা সুপারিশ তৈরি করেছেন এই সমিতির নেতারা।
আগামী ২১ জানুয়ারি ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর নেতৃত্বে ঢাকায় আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় তারা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশমালা উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকার সর্বশেষ যখন ভাড়া বাড়িয়েছিল ২০২২ সালে, তখন ডলারের রেট ছিল ১০৬ টাকা; এখন সেটি হয়েছে ১২২ টাকা। সেই হিসাবে গাড়ির স্পেয়ার পার্টস, চাকাসহ সব ধরনের যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। আমাদের ব্যবস্থাপনা খরচও বেড়েছে। আগে একজন কাউন্টার ম্যানেজারকে যদি ১০ হাজার টাকা দিতে হতো, তবে এখন দিতে হবে অন্তত ১৫ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে আমাদের দাবি, নগর পরিবহন, আন্তজেলা, দূরপাল্লার সব রুটে বাস ভাড়া অন্তত ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হোক।’
আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনে যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ভাড়া ২ দশমিক ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারিত হয়। ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল তৎকালীন সরকার ডিজেলের মূল্য হ্রাস ও বর্তমান পরিচালনা ব্যয়জনিত কারণে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের সর্বোচ্চ ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করে। ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচল করা বাসের ভাড়া তিন পয়সা কমিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে সর্বোচ্চ ভাড়া ২ টাকা ১৫ পয়সা টাকার স্থলে ২ টাকা ১২ পয়সা নির্ধারণ করা হলো। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাসের ক্ষেত্রে যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৪৫ পয়সার পরিবর্তে ২ টাকা ৪২ পায়সা নির্ধারণ করা হলো।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অধীন জেলার (নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলা) অভ্যন্তরে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাস উভয় ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৩৫ পয়সার স্থলে ২ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে ১০ টাকা এবং ৮ টাকা আগের মতো বহাল থাকবে।
এখন বাসমালিকদের দাবি মোতাবেক প্রতি কিলোমিটারে ৪০ শতাংশ ভাড়া বাড়ালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রতি কিলোমিটারে বাস ভাড়া হবে ৩ টাকা ৩৮ পয়সা। আর আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে বেড়ে দাঁড়াবে ২ টাকা ৯৬ পয়সা।
২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া পাঁচ পয়সা কমানো হয়েছিল। কিন্তু তা মানেননি পরিবহন-মালিক ও শ্রমিকরা। অথচ এর ১ মাস আগে ৬ আগস্ট ভাড়া ৪০ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তবে সেই হার ঘোষণার আগেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেন। গত বছর যখন বাস ভাড়া কমানোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তখন এ নিয়ে যাত্রী সংগঠনগুলোর নেতারা উষ্মা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, ‘দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য কমানোর হিস্যা অনুযায়ী বাস ভাড়া কমানোর পরিবর্তে প্রতি কিলোমিটারে মাত্র তিন পয়সা কমিয়ে সরকার দেশের যাত্রীসাধারণের সঙ্গে তামাশা করছে।’
২০২৪ সালে সরকারের বাস ভাড়া নির্ধারণের পর দেখা যায়, নতুন ভাড়া অনুযায়ী একজন যাত্রী ৩৩ কিলোমিটার ভ্রমণ করলে তার এক টাকা সাশ্রয় হবে। এবারও যখন ভাড়া বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে তারও বিরোধিতা করছেন পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্য কমিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এখন সে অনুপাতে বাস ভাড়া কমানোর কথা, কিন্তু বাসমালিকরা তা করবেন না। সরকার একটি ভাড়া নির্ধারণ করে দেবে, আর বাসমালিকরা তাদের খেয়াল-খুশিমতো ভাড়া আদায় করবেন। বাস ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টিও হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মো. ইয়াসীনকে ফোন করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরিবহন-মালিকরা আবার নতুন করে বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। এতে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন সায় না এলেও প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সভাতেই বাসমালিকরা এ নিয়ে তর্ক জুড়ে দিচ্ছেন।
এদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়াও পুনর্নির্ধারণ করতে চান মালিকরা। শ্যামলী পরিবহনের কর্ণধার রমেশ ঘোষ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রংপুর রুটে এসি বাসে একেক পরিবহন একেক রকম ভাড়া আদায় করছে। সমিতি নির্ধারিত ভাড়া থেকে কেউ কম, কেউবা বেশি টাকা আদায় করছে। হুন্দাই, ম্যানিয়া, স্ক্যানিয়া, বিজনেস ক্লাসে কোনো পরিবহন আদায় করছে ১ হাজার ২০০ টাকা, কেউবা ১ হাজার ৪০০ টাকা। আনকার, হাইগার, অশোক লিল্যান্ড বাসেও একেক রকমের ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা এসি বাসমালিকরা সভা করেছি। তবে এখনো কিছু চূড়ান্ত করা হয়নি।’