এফসিপিএস প্রশিক্ষণ নীতিমালা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘বৈষম্যমূলক’ প্রস্তাব বাতিলসহ ৬ দফা দাবিতে এবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
রবিবার (৭ জুন) সকাল থেকে দুই শীর্ষ সরকারি হাসপাতালের ইন্টার্নরা একযোগে এই কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত এই দুই হাসপাতালে সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সমন্বিত ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐক্য পরিষদের ডাকে এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে স্থানীয় ইন্টার্ন ডক্টরস সংগঠনগুলো।
ঢামেকে জরুরি বিজ্ঞপ্তির পর কর্মবিরতি
শনিবার রাতে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কর্মবিরতির ডাক দেয় ঢামেক হাসপাতাল ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটি। সংগঠনের সভাপতি ডা. মোস্তফা আমীর ফয়সাল ও সাধারণ সম্পাদক ডা. নাবিল বিন কাশেম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এফসিপিএস প্রশিক্ষণ নীতিমালার অযৌক্তিক প্রস্তাব, ভর্তি পরীক্ষার অতিরিক্ত ফি, ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের অপ্রতুল ভাতা, কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন কাঠামোর অনিশ্চয়তার প্রতিবাদে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। বারবার আশ্বাস সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংগঠনটি।
ঢামেক হাসপাতাল ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ডা. আশরাফ সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আজ (রবিবার) সকাল থেকে আমাদের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। চিকিৎসক সমাজের ন্যায্য দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চলমান থাকবে। আমরা দ্রুত কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
আল্টিমেটাম শেষে চমেক হাসপাতালেও ধর্মঘট, ক্লাস বর্জন
একই দাবিতে রবিবার সকাল ৮টা থেকে চমেক হাসপাতালেও কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এর আগে গত ৪ জুন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ শেষে হাসপাতাল পরিচালকের মাধ্যমে সরকারকে শুক্রবার (৫ জুন) রাত পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ বা কার্যকর উদ্যোগ না আসায় শনিবার রাতে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে রবিবার সকাল ১১টার পর থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টায় চমেক হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
চমেক ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলমান থাকবে। প্রয়োজন হলে সারাদেশে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
কী আছে ৬ দফা দাবিতে
আন্দোলনরত চিকিৎসকদের প্রধান দাবিগুলো হল-
# এফসিপিএস পার্ট-১ উত্তীর্ণ বেসরকারি প্রশিক্ষণার্থীদের পদায়নের বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক নীতিমালা সংক্রান্ত কমিটির প্রস্তাবনা (স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত) বাতিল করা।
# বিএমইউ এবং বিসিপিএস-এর ভর্তি পরীক্ষার ফি কমিয়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে আনা।
# নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী ইন্টার্নদের ভাতা ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা এবং ট্রেইনিদের ৯ম গ্রেডে নির্ধারণ করা।
# কর্মস্থলে চিকিৎসকদের সুরক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ বা ‘স্বাস্থ্যকর্মী নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করা।
# বিসিএস স্বাস্থ্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৪ বছর করা।
# বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য শ্রম আইন ২০০৬ মেনে সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারণ এবং বিএমডিসি আইনের সংস্কার।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত না এলে এই কর্মবিরতি দেশের অন্যান্য সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছেন আন্দোলনরত চিকিৎসক নেতারা।
জয়ন্ত সাহা/এসএন