বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের মূল্যস্ফীতি কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাপ্লইচেইন ইকোসিস্টেম বজায় রেখে ব্যবসাবান্ধব এবং জনতুষ্টিমূলক বাজেট প্রদান করায় চেম্বারের নেতৃবৃন্দ ধন্যবাদ জানান। জনগণের উপর ভ্যাট ও করের চাপ কমিয়ে করজাল বাড়ানো এবং দেশি-বিদেশী উৎস থেকে অর্থ সংস্থানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের এই বাজেটকে ঐতিহাসিক বলে মন্তব্য করেন চেম্বার নেতারা।
বাজেটে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও দেশি-বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নতুন নীতিমালা নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দুরত্ব ৮০ কি.মি. কমানোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্প কারখানায় নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আবাসনসহ সকল ধরণের ইউটিলিটি সেবা বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ উপযোগী করার আহবান জানান নেতারা।
বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস গুরুত্ব দেয়াকে দেশীয় সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। বাজেটে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে মানবসম্পদ উন্নয়ন তথা শিক্ষা খাতকে।
ব্যক্তি করদাতাদের টার্নওভার করের আওতামুক্ত সীমা ৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি এবং ব্যাংক স্থিতির ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে, এতে সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হবে। এছাড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনির উপকারভোগীদের ভাতার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ফ্যামিলি কার্ড জনপ্রতি ২৫০০ টাকা, প্রতিবন্ধী ভাতা, পর্যায়ক্রমে সকল কৃষককে কার্ড প্রদান এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানত ছাড়া ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা, বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় গমনেচ্ছুদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদান যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
বাজেটে কর্পোরেট কর ব্যবস্থা সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করায় অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচ বাড়ানো এবং কর্পোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা ইতিবাচক। পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানীর করহার শর্তসাপেক্ষে ২২.৫%, পাবলিকলি ট্রেডেড ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানীর ক্ষেত্রে ৩৭.৫%, পাবলিকলি ট্রেডেড নয় কোম্পানীর ক্ষেত্রে ৪০%, মোবাইল অপারেটর কোম্পানীর জন্য ৪৫%, বাংলাদেশী অনিবাসী করদাতাদর জন্য ৩০%, ট্রাস্ট ফার্ম ও ব্যক্তিসংগ প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৭.৫%, সমবায় সমিতি ২০%, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০% করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার ১০% করায় উদ্যোক্তারা শিক্ষা খাতে আগ্রহী হবে।
এছাড়া আমদানিকৃত ১১৩টি পণ্যের রেগুলার ডিউটি প্রত্যাহার, ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ৬৯টি পণ্যের কাস্টমস ডিউটি ২৫% থেকে ১৫% নির্ধারণ, শিশু খাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহ্রাস, সকল মসলা আমদানিতে রেগুলেটরী শুল্ক ও খেজুর আমদানিতে রেগুলেটরী শুল্ক ৫% প্রত্যাহার, পোল্ট্রি, ডেইরী ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামালে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করায় মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করেন নেতারা।
বাজেটে জ্বালানী সক্ষমতা বাড়াতে এবং সৌর বিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে সোলার প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারীসহ আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রপাতিতে রেয়াতি সুবিধা দেয়ায় জ্বালানী সক্ষমতা বাড়বে এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান এবং ইলেক্ট্রিক ভেহিকেল (ইভি) আমদানিতে অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানোর ফলে একদিকে যেমন জ্বালানীর উপর চাপ কমবে, তেমনি সৌর বিদ্যুৎ শিল্প এবং সেমি কন্ডাক্টর শিল্পে দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। ক্যান্সার ঔষধ উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা প্রদানে ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫% অগ্রিম কর মওকুফ করায় সাধারণ রোগীরা স্বস্তি পাবেন।
সরকার আইটি সেক্টরকে উৎসাহিত করতে এবং ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার জন্য কর অব্যাহতি সুবিধা, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে আয়কে করমুক্ত করা, স্টার্টআপ, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য করা, এসএমই উদ্যোক্তাদের টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত সীমা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাইরে যেকোন উৎপাদানমুখী শিল্প পর্যটন বা ক্রীড়া ক্ষেত্রে স্থাপনা ও যন্ত্রপাতি বিনিয়োগের উপর ১ম বর্ষে ৬০%, ২য় বর্ষে ৪০% হারে ত্বরান্বিত অবচয় সুবিধা প্রদান করায় দেশে তরুণ প্রজন্ম, নারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন স্থানে শিল্প কারখানা বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।
দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল করতে এবং পণ্যজট শূন্য করতে অফডক ও আইসিডি খাত, লজিস্টিক্স, বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর বিষয়ক বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করার মাধ্যমে চট্টগ্রামে বন্দরকেন্দ্রিক দেশি-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এণ্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, আমাদের সাধ আছে, সাধ্য কম। তারমধ্যেও যে বাজেট হয়েছে সেটা সন্তোষজনক। বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। আমার মনে হয়, স্বাধীনতার পর থেকে এমন সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি, এই বাজেট সকলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
বাজেটের চাপ সাধারণ মানুষের উপর পড়বে: শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বাজেট বেশি বড় হয়নি। বর্তমান সরকার একটি সময় উপযোগী বাজেট দিয়েছে। কিন্তু বাজেটে যাই হোক না কেন বাজেটের চাপ সাধারণ মানুষের উপর পড়বে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করেছে। এটি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ বাজেট, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা হল- রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দেশিয় ঋণ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের সুশাসন নিশ্চিত করা, বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত ব্যাংকের সমস্যা সমাধান করা। এলসি তরান্বিত করা। বন্দরের ট্যারিফ অনেক বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেটি কস্টবেইজ করা উচিত ছিল। কিন্তু বন্দরের চেয়ারম্যান আমাদের বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের সাথে তুলনা করে করা হয়েছে। বুঝতে হবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অর্থনীতি আর আমাদের অর্থনীতির বৃহৎ তফাৎ রয়েছে। আমাদের দেশে যেদিকেই মূল্য বৃদ্ধি করা হোক সেটি অবশ্যই গিয়ে পড়ে ভোক্তাদের উপর। কারণ ব্যবসায়ীরা কেউ লোকসান দিয়ে ব্যবসা করবে না। আসল কথা হলো ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি করে দিন।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, এবারের বাজেট দেখে মনে হচ্ছে দৈনন্দিন জিনিসপত্রের দাম কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে মসলা, খেজুর এবং কিছু ফলের দাম কমবে। সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে এটা একটা জনবান্ধব বাজেট হতে পারে। এই বাজেটটা নিয়ে আমরা অনেক আশাবাদী। দেখা যাক, সামনে কী হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বাজেটে সামগ্রিকভাবে সকল খাতই আলোচনায় এসেছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো—এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে কীভাবে? বর্তমান এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কি আরও বেশি রাজস্ব সংগ্রহে সক্ষম? এ বিষয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর আরও বেশি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে তরুণরা কর্মসংস্থানের জন্য আরও প্রস্তুত হতে পারে। পর্যটন খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বর্তমান ব্যবস্থা এখনো পর্যটনবান্ধব নয়।