উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মের আলো আর বলকান পর্বতমালার গর্ব–দুই ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে। অর্থাৎ ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপে ‘বি’ গ্রুপের ম্যাচে টরন্টোতে মুখোমুখি হচ্ছে সহ-আয়োজক কানাডা এবং ইউরোপের অভিজ্ঞ দল বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা। বিএমও ফিল্ডে ম্যাচটি মাঠে গড়াবে বাংলাদেশ সময় আজ (১২ জুন) রাত ১টায়। এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক মুখোমুখি লড়াই হতে যাচ্ছে দুদলের। বিশ্বকাপে তো বটেই, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দল দুটির কখনো দেখা হয়নি। যে কারণে পূর্বের পরিসংখ্যান নয়, বর্তমান ফর্মই ফলাফল নির্ণায়কে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ফুটবল পণ্ডিতরা।
- টরন্টোয় শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ। ঘরের মাঠে জয়ে শুরুর আশা কানাডার। ইতালিকে বিদায় করে বিশ্বমঞ্চে আসা বসনিয়ারও অভিন্ন লক্ষ্য। আজ রাতে এই ম্যাচ শুরুর ৯০ মিনিট আগে হবে কানাডা পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
একদিকে ঘরের মাঠে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর কানাডা, অন্যদিকে অভিজ্ঞ তারকাদের নেতৃত্বে চমক দেখাতে প্রস্তুত বসনিয়া। কানাডিয়ানদের জন্য এটি কেবল একটি ম্যাচ নয়, বরং বিশ্বকাপে নিজেদের নতুন পরিচয় তুলে ধরার মঞ্চ। ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে বিশ্বকাপ খেললেও এখন পর্যন্ত আসরের ইতিহাসে কোনো ম্যাচ জেতেনি উত্তর আমেরিকার দেশটি। এবার নিজেদের মাটিতে সেই আক্ষেপ ঘোচানোর সুযোগ পাচ্ছে তারা। কোচ জেসি মার্শের অধীনে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দলটি অনেক পরিণত হয়েছে। ২০২৪ কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ওঠার পর থেকেই কানাডাকে নতুন চোখে দেখা শুরু করেছে ফুটবলবিশ্ব।
তবে স্বাগতিকদের জন্য বড় ধাক্কা অধিনায়ক আলফানসো ডেভিডের চোট। উদ্বোধনী ম্যাচে শেষ পর্যন্ত তিনি না থাকলে কানাডার আক্রমণভাগে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে গোলের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়বে দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা জোনাথন ডেভিডের কাঁধে। গোলরক্ষক ম্যাক্সিম ক্রেপাউ বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলতে প্রস্তুত। অন্যদিকে বসনিয়া দীর্ঘ ১২ বছর পর আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেছে। ২০১৪ সালে প্রথমবার খেলেছিল দলটি, এবার দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের স্বাদ নিতে যাচ্ছে তারা। দলের সবচেয়ে বড় ভরসা ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার এডিন জেকো। জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ফরোয়ার্ডের অভিজ্ঞতা তরুণ খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করছে। তার সঙ্গে রক্ষণভাগে থাকবেন অভিজ্ঞ সিদ কোলাসিনাক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে কানাডা কিছুটা এগিয়ে থাকবে ঘরের মাঠের সমর্থন এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কারণে। তবে বসনিয়ার ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা এবং জেকোর মতো ম্যাচজয়ী ফুটবলারের উপস্থিতি তাদের বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। গ্রুপে আরও রয়েছে কাতার ও সুইজারল্যান্ড। ফলে প্রথম ম্যাচে জয় দুদলের জন্যই নকআউট পর্বে যাওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে। টরন্টোর গ্যালারি যখন লাল-সাদা রঙে রাঙাবে কানাডার সমর্থকেরা, তখন বসনিয়ার সমর্থকরাও আশা করবেন জেকোর পায়ে নতুন কোনো রূপকথার সূচনা। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দুই দলের লক্ষ্য একটাই জয়ের হাসি নিয়ে স্বপ্নের যাত্রা শুরু করা।
কানাডার শক্তি গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও ট্রানজিশনে। জোনাথন ডেভিড এই দলের প্রধান গোলভরসা, আর উইং ও কাউন্টার-অ্যাটাকে কানাডা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কোচ জেসি মার্শ আগ্রাসী প্রেসিং ও দ্রুত আক্রমণ পছন্দ করেন। তবে চোটের কারণে অধিনায়ক আলফনসো ডেভিস এই ম্যাচে নাও থাকতে পারেন, যা কানাডার জন্য বড় ধাক্কা। মিশন শুরুর আগে কানাডা কোচ জেসি মার্শ বলেন, বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস বদলানোর সুযোগ এসেছে; স্বাগতিক চাপকে শক্তিতে রূপ দিতে চান। স্ট্রাইকার জোনাথন ডেভিড বলেন, ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলার অনুভূতি অসাধারণ; দলের লক্ষ্য শুধু অংশ নেওয়া নয়, ইতিহাস গড়া।
অন্যদিকে বসনিয়ার শক্তি অভিজ্ঞতা, সংগঠিত রক্ষণ এবং সেট-পিসে। কিংবদন্তি এডিন জেকো এখনো দলের অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি এরমেদিন দেমিরোভিচ, বেনিয়ামিন তাহিরোভিচদের মতো নতুন প্রজন্ম দলকে গতি ও শক্তি দিচ্ছে। কোচ সের্গেই বারবারেজ দলকে শারীরিক ও দ্রুত ট্রানজিশনভিত্তিক ফুটবলে রূপ দিতে চাচ্ছেন। কোচ সের্গেই বারবারেজ বলেন, তারা বড় দলকে ভয় পায় না; সংগঠিত থেকে সুযোগ কাজে লাগাতে চান। অভিজ্ঞ অধিনায়ক এডিন জেকো জানিয়েছেন, এটি তার শেষ বিশ্বকাপ। তাই প্রতিটি মিনিট উপভোগ করে লড়াই করতে চান। মিডফিল্ডার বেনিয়ামিন তাহিরোভিচ বলেছেন, কানাডার গতি থামাতে হলে মাঝমাঠে শৃঙ্খলা জরুরি।
কানাডা স্বাগতিক দেশ হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপে হতাশাজনক ফলের পর দলটি নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে। কোপা আমেরিকায় সেমিফাইনাল খেলা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এবার লক্ষ্য প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছানো। বসনিয়ার বাছাইপর্বের পথটা ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। প্লেঅফে তারা ওয়েলস ও ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে। বিশেষ করে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে বিদায় করে টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেওয়া তাদের আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় উৎস। যে কারণে এবারের বিশ্বকাপে বসনিয়া বড় চমক উপহার দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অনিক/