২০১৪ সালে এসএসসির পাঠ চুকিয়ে কুষ্টিয়া থেকে রাজধানীর নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন আবরার ফাহাদ। চোখে-মুখে ছিল প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নও বাস্তবে রূপ নেয়। ভর্তি হন দেশসেরা শিক্ষায়তন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। কিন্তু দ্বিতীয় বর্ষে এসে সেই স্বপ্ন যেন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর নৃশংসভাবে তৎকালীন ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বুয়েট শাখার নেতা-কর্মীদের নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্তান হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে আবরার ফাহাদের পরিবার।
রবিবার (১৬ মার্চ) মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। এ ঘটনায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থী ও আবরারের পরিবার। এ সময় তারা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবিও জানান।
এদিন বিকেলে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয় আবরার ফাহাদের ভাই এবং বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজের সঙ্গে। এই রায়ে পরিবার সন্তুষ্ট বলে উল্লেখ করে ফাইয়াজ বলেন, ‘এর আগেই তো রায় হয়েছিল। এখানে খুশি হওয়ার কিছু নেই, ২১ জনের মানুষের মতো জীবন এবং তাদের পরিবার জড়িত, কিন্তু বিচার তো হতে হবে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটিই আমাদের চাওয়া। সব মিলিয়ে আমাদের পরিবার এ রায়ে সন্তুষ্ট। এখন পরবর্তী আপিলেরও একটি বিষয় থেকে যায়। সেটি যেন নিষ্পত্তি করে এই রায় বহাল থাকে এমনই প্রত্যাশা থাকবে। সেই সঙ্গে রায়টি যেন অতিদ্রুত কার্যকর করা হয়, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
এই হত্যা মামালায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি গত ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালান বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি জানায় কারা কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া একই মামলার আসামি মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং মুজতবা রাফিদ পলাতক রয়েছেন।
পলাতক এই আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা জানতে চেয়েছেন আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখনো আবরার হত্যা মামলার আসামিরা পলাতক। যারা এখনো পলাতক রয়েছেন তাদের ধরতে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। অন্তত হলেও তো একটি প্রক্রিয়া রয়েছে, সেটি যেন আমাদের অবগত করা হয়- পলাতক আসামি ধরতে এই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
এদিকে রায়ের পরপরই বুয়েটের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হয়। সবাই এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াটার রিসোর্সেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ডব্লিউআরই) বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এমন রায়ে আমরা বুয়েট শিক্ষার্থীর সবাই সন্তুষ্ট। অতিদ্রুত যেন এ রায় কার্যকর করা হয়। আমরা চাই, এমন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি শুধু বুয়েটে না, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা না ঘটে।’
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সবাই সন্তুষ্ট। আমরা, সব শিক্ষার্থীরা, এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছি। আমরা চাই, পলাতক আসামিদের অতিদ্রুত গ্রেপ্তার করে যেন দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হয়।’
বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাঠানো ওই বিবৃতিতে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় পুনর্বহালকে মাইকফলক উল্লেখ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘এই মামলাটি আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু একটি বিচারিক রায় নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাসমুক্ত করার সংগ্রামের একটি মাইলফলক।’
বিবৃতিতে বলা হয়, এই রায়ে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট এবং তারা রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান। বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, দ্রুত খুনি মুনতাসির আল জেমিসহ বাকি সব পলাতক আসামিকে খুঁজে বের করে আটক করতে হবে। পাশাপাশি জেমির পলায়নকার্যে সহযোগিতাকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
যেভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির সূত্রে সরব ছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। মৃত্যুর দিনেই কুষ্টিয়ার বাড়ি থেকে বুয়েটে এসে শেরেবাংলা হলে নিজের ১০১১ কক্ষে এসেছিলেন। ফেসবুকে ভারতবিরোধী একটি পোস্টের জের ধরে রাত ৮টার দিকে তাকে ডেকে নিয়ে যান বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। রাত ৮টার দিকে আবরারসহ দ্বিতীয় বর্ষের সাত-আটজন ছাত্রকে হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাত-আটজন নেতা। একপর্যায়ে আবরার ফাহাদের মোবাইল নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ঘেঁটে দেখার পর তাকে শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ আনেন। আবরার এসব অস্বীকার করলে স্টাম্প দিয়ে তাকে পেটাতে শুরু করেন।
সেখানে কয়েক দফা পেটানো হয় তাকে। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মধ্যবর্তী জায়গায় অচেতন আবরারকে নিয়ে যান তারা। অচেতন আবরারের চিকিৎসার জন্য হল প্রভোস্ট ও চিকিৎসককে খবর দেন ছাত্রলীগের সেসব কর্মী। পরে বুয়েট মেডিকেলের ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর মধ্যে খবর পেয়ে রাত ২টার দিকে টহল পুলিশের একটি দল হলের প্রধান ফটকে গেলে তাদের হলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে রাত ৪টার দিকে পুলিশ আবার হলে যায়। এরপর ডাক্তার মৃত ঘোষণার পর তারা লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। আবরার মৃত্যুর খবর ছড়িয়েছে পড়লে মুহূর্তে উত্তাল হয়ে পড়ে বুয়েট। ঘটনার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
ঘটনার এক দিন পর আবরার হত্যার ঘটনায় ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করেন তার বাবা মো. বরকত উল্লাহ। ওই বছরের ১১ অক্টোবর বুয়েটে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে আবরার হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার ১৯ জন আসামিকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পরে ২১ নভেম্বর বুয়েটের বোর্ড অব রেসিডেন্ট অ্যান্ড ডিসিপ্লিন থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে ২৬ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ৬ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। এর ভেতর ২৫ জনের নাম ছিল পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে।
এরপর ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে একদল ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর নাম উঠে আসে। ট্রাইব্যুনালের বিচারক আবু জাফর কামরুজ্জামান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।