বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রবিবার (১ জুন) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। এদিকে অভিযোগ আমলে নেওয়ার মাধ্যমে গতকাল ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো।
এই মামলার আসামি পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে এদিন বিচারকাজ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বিচারিক কার্যক্রমের শুরুতে তা সম্প্রচারের অনুমতি চেয়ে আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। আদালত তা মঞ্জুর করলে বিচারকাজ বিটিভির মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিচারকাজ সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, দেশে এই প্রথম আদালত থেকে বিচার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার হলো। আদালত থেকে বের হওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর জানান, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ভবিষ্যতেও ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার হতে পারে।
এদিন ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন থেকে এই আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপন করা পাঁচটি অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
অভিযোগগুলো হচ্ছে-
১. ২০২৪ সালের ১৪ জুন গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য’ এবং অন্য দুই আসামিসহ তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় তাদের অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র ‘আওয়ামী সন্ত্রাসী’ কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণের অংশ হিসেবে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ করার অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, অপরাধ সংঘটন প্রতিরোধে ব্যর্থতা, অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান না করা এবং ষড়যন্ত্র করার অপরাধ; যা আসামিদের জ্ঞাতসারে সংঘটিত।
২. আসামি শেখ হাসিনা কর্তৃক ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে হত্যা করে আন্দোলন নির্মূলের নির্দেশ এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসামি আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইজিপি আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন কর্তৃক ওই নির্দেশ বাস্তবায়নে তাদের অধীন বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা দিয়ে কার্যকর করার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ প্রদান, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন। যা তাদের জ্ঞাতসারে কার্যকর করা হয়েছে।
৩. আসামি শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য এবং মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য দুই আসামির প্ররোচনায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে স্বল্প দূরত্ব থেকে সরাসরি নিরস্ত্র আন্দোলনকারী ছাত্র আবু সাঈদের বুক লক্ষ্য করে বিনা উসকানিতে একাধিক গুলি চালিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
৪. আসামি শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য এবং মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য দুই আসামির প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা মহানগরীর চাঁনখারপুল এলাকায় নিরস্ত্র ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করার মাধ্যমে আসামিদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের কর্তৃক হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্র করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
৫. গত ৫ আগস্ট ঢাকা জেলার আশুলিয়ায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর মাধ্যমে হত্যা, মৃত ও জীবিত অবস্থায় আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে অমানবিক আচরণ করার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন।
অভিযোগ উত্থাপনকালে প্রসিকিউটর বলেন, ‘মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়েছে। এতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রটি ১৩৫ পৃষ্ঠার। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৮১ জনকে। ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য আমরা যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করব সেগুলো হচ্ছে-’
১। প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিত ভিক্টিমদের সাক্ষ্য
২। অপরাধ সংগঠনের সময় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ
৩। ড্রোন এবং সিসিটিভি ফুটেজ
৪। আসামিদের মধ্যে টেলিফোন সংলাপের অডিও ক্লিপস
৫। ডিজিটাল অ্যাভিডেন্সগুলোর ফরেন্সিক রিপোর্ট
৬। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
৭। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য, ছবি এবং ভিডিও
৮। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রস্তুত করা রিপোর্ট এবং
৯। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে প্রাপ্ত অফিশিয়াল ডকুমেন্টস ইত্যাদি।
আগামী ১৬ জুন এই মামলার তিন আসামিকে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
অভিযোগ উপস্থাপনকালে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আজ ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তে এই ট্রাইব্যুনালের এই পবিত্র কক্ষে দাঁড়িয়ে, আমি শুধু একজন আইনজীবীই নই, ইতিহাসের এক তাজা রক্তাক্ত অধ্যায়ের সশ্রদ্ধ ভাষ্যকার।’ তিনি বলেন, ‘এই বিচার কেবল অতীতের প্রতিশোধ নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা। আমরা প্রমাণ করতে চাই একটি সভ্য সমাজ, যেখানে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন থাকবে-সেখানে গণহত্যা কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না।’
এর আগে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, জুলাই আন্দোলন নির্মূলে পরিচালিত নির্বিচারে গণহত্যার অপরাধে শেখ হাসিনার বিচার আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে। গতকাল তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে এক পোস্টে এ কথা বলেন তিনি। পোস্টে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত টিম দিনরাত পরিশ্রম করে গণহত্যার বিচারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শহিদ ওয়াসিমের বাবার একটি ছবি ফেসবুক পোস্টে আপলোড করে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে প্রথম যারা প্রাণ দিয়েছেন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম ছিলেন তাদের অন্যতম। আবু সাঈদ, মুগ্ধ আর ওয়াসিমের পরিবারের (এবং আমাদের সবার) বিচারের প্রতীক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিটিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। আমাদের প্রসিকিউশন ও তদন্ত টিম দিনরাত পরিশ্রম করে গণহত্যার বিচারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। আমরা এই বিচারে সব ডিউ প্রসেস অনুসরণ করব।
ইনশাআল্লাহ, সুষ্ঠুভাবে বিচার করেই শেখ হাসিনা ও অন্য অপরাধীদের দোষ প্রমাণ করা হবে।’
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বাইরে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সকালে দুর্বৃত্তরা আইসিটির দ্বিতীয় গেটের সামনে তিনটি ককটেল নিক্ষেপ করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। এর মধ্যে দুটি বিস্ফোরিত হলেও অবিস্ফোরিত একটি ককটেল উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদ মনসুর বলেন, ‘ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দুর্বৃত্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’