জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে এবং একজনের দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার বিধান যুক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন ও গোপন ব্যালটে তারা ভোট দাবি করলেও কোন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, সে বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি।
এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও এনসিসি গঠনের পক্ষে বেশির ভাগ দল মত দিলেও একমত হতে পারেনি সব দল।
বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের মুলতবি বৈঠকের পর এসব তথ্য জানিয়েছেন আমন্ত্রিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে সভায় অংশ নেন আমন্ত্রিত ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা। বৃহস্পতিবার বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সংবিধান ও রাষ্ট্রের মূলনীতি এবং নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণসহ আগের দিন অসমাপ্ত বিষয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি।
এদিকে গতকাল ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে আসনবিন্যাসে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ কয়েকটি দলের নেতারা। এ ছাড়া কমিশনের সংলাপে মহাজোটের দুই শরিককে আমন্ত্রণ জানানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ও বাংলাদেশের লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান। তারা এ বিষয়ে কমিশনের ব্যাখ্যা দাবি করে আগামীতে এমনটি হলে বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করার হুমকি দিয়েছেন।
আলোচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের ব্যাপারে বিপরীতমুখী অবস্থানে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি। এ ক্ষেত্রে বর্ধিত ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছে জামায়াত। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ইলেকটোরাল কলেজব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে ৭০ হাজার জনপ্রতিনিধি ভোটার হিসেবে থাকবেন। ইলেকটোরাল কলেজের সংখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও প্রস্তাব এসেছে।
একটি প্রস্তাব হলো, সংসদ যদি উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষে বিভক্ত হয়, তাহলে ৫০০ ইলেকটোরাল কলেজ। আরেকটি প্রস্তাব হলো, উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষের সদস্যদের পাশাপাশি জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে ইলেকটোরাল কলেজের সংখ্যা ৫৭৬ করা। এ বিষয়ে দলটির নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, এ ক্ষেত্রে তিনটির মধ্যে যেকোনো প্রস্তাব গ্রহণ করতে রাজি আছেন। তিনি জানান, ভোটারের সংখ্যার বিষয়ে তাদের অবস্থান নমনীয় থাকবে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত ইলেকটোরাল কলেজব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মনে করেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, ৭০ হাজার স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিকে ভোটার করে এই নির্বাচন করার প্রস্তাব তাদের কাছে এখন গ্রহণযোগ্য নয়। তবে ভবিষ্যতে যদি সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়, তখন তা বিবেচনার বিষয় হতে পারে।
সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতির প্রস্তাবের সঙ্গে একমত জানিয়েছে গণসংহতি আন্দোলন। দলটির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা চাই গোপন ব্যালটের ভিত্তিতে এই নির্বাচনটা হবে। এ প্রস্তাব আরও অনেকে দিয়েছেন, আমরা এ প্রস্তাবের সঙ্গে একমত।’ তিনি জানান, যেহেতু গত দুই দিনের আলোচনায় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের দলের বিপক্ষেও ভোট দিতে পারবেন। ফলে এ বিষয়ে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল মত দিয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে দু-একটি দলের প্রস্তাবকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান দু-একটি দলের নেতৃত্বে হয়নি, সুতরাং কোনোভাবেই দু-একটি দল কিংবা কোনো বিশেষ ব্যক্তি মহলের প্রস্তাবকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।’ এ ছাড়া নুরের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের দোসর ছিল এমন রাজনৈতিক দলও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানদের মারফতে তদবির করে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। কমিশনের এ ধরনের সিদ্ধান্তকে তিনি জুলাইয়ের প্রতি অবমাননা ও শহিদদের সঙ্গে বেইমানি বলে মন্তব্য করেন।
বৈঠক শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নিয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল একমত। আলোচনায় উচ্চকক্ষে ১০০ আসনের বিষয়ে মত দিয়েছে, তবে উচ্চকক্ষে নির্বাচন-প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সবাই একমত হতে পারেনি। তবে প্রতিটি দল স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত জানাতে পারছে। আলোচ্য কিছু বিষয়ে মতভিন্নতা থাকলেও মতামত প্রদানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বিরাজ করছে। কিন্তু এসব বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও বিষয় নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ড. আলী রীয়াজ জানান, যেসব বিষয়ে তারা ঐকমত্য হবে না, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে উল্লেখ করা হবে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন প্রত্যাশা করাও ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হওয়ার সদিচ্ছা রয়েছে। এ নিয়ে আগামী রবিবার (২২ জুন) জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের অধিবেশনের দ্বিতীয় ধাপের পঞ্চম দিনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।