বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিনটি সাক্ষাৎকার বুধবার (২৯শে অক্টোবর) একযোগে ৩টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো হচ্ছে ব্রিটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও ফরাসি বার্তা সংস্থা এসোসিয়েট প্রেস (এএফপি)।
তবে একটি বিষয় লক্ষনীয় হচ্ছে যে, সাক্ষাৎকারগুলোতে মোটামুটি একই ধরনের কথাবার্তা বলেছেন তিনি। বস্তুত ইমেইলে পাঠানো প্রশ্নমালার লিখিত উওরের ভিত্তিতে প্রতিবেদনগুলো লেখা হয়েছে।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের ক্ষেত্রে বর্তমানে নানান বিধিনিষেধ থাকলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম তার সাক্ষাৎকার গ্রহণে আগ্রহী থাকলেও এতদিন তাতে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
গণহত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ অন্য অভিযুক্তদের চলমান বিচারের আগামী মাসে (নভেম্বর) তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার প্রবল সম্ভাবনা আছে।
ধারণা করা যায়, এমন প্রেক্ষাপটে রায় ঘোষণার আগেই শেখ হাসিনার বক্তব্যও তুলে ধরার জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্পর্ক রক্ষার দিকটি মূলত এখন দেখছেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। তারা এই গণমাধ্যমগুলোকে জানান, শেখ হাসিনা ইমেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে প্রস্তুত আছেন। সেসময় অনেকগুলো গণমাধ্যম আউটলেট বা বার্তা সংস্থা অনাগ্রহ দেখায়। কারণ ই-মেইলে লিখিত সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে প্রতিপ্রশ্ন বা সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকবে না।
তবে অনেকটা সময় গড়িয়ে যাওয়ার পর তিনটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার ‘লিখিত’ সাক্ষাৎকারই নিতে চায় বলা যায়। তবে সেক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগের শর্ত ছিল যে, একই দিনে ৩টি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারগুলো একযোগে প্রকাশ করতে হবে। তাদের ব্যাখ্যা-এতেই সাক্ষাৎকারগুলোর ‘ইমপ্যাক্ট’ বা অভিঘাত সবচেয়ে বেশি হবে।
জানা গিয়েছে, রয়টার্স, এএফপি ও দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এই শর্তে রাজি হওয়ার পরই তাদের প্রশ্নমালার জবাবে শেখ হাসিনা লিখিত উত্তর পাঠান এবং ২৯ অক্টোবর সেগুলো একসঙ্গে প্রকাশিত হয়।
প্রসঙ্গত, কয়েক মাস আগে ভারতের একটি জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপত্র, ‘দৈনিক যুগশঙ্খে’ও শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল—আর সেটিও দেওয়া হয়েছিল লিখিত আকারে। তবে পত্রিকাটি বাংলাদেশে তেমন পরিচিত না হওয়ায়—তা নিয়ে সম্প্রতি সাক্ষাৎকারের মতো এত আলোচনার সৃষ্টি হয়নি।
এদিকে, দিল্লিতে সিনিয়র কূটনৈতিক সংবাদদাতা নয়নিমা বসু মনে করেন, ‘এক সঙ্গে শেখ হাসিনার তিন-তিনটি সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার হলো, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র না পেলে এটা কিছুতেই সম্ভব হতো না।
নয়নিমা বসুর মতো আরো অনেক পর্যবেক্ষকই মনে করছেন, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান ও তার নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়গুলো দেখছে অমিত শাহ্-র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (অবশ্যই জয়শংকরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে), কাজেই তাদের অনুমতি সাপেক্ষেই পুরো বিষয়টি হয়েছে।
নয়নিমা বসু আরও বলেন, ‘সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি যে ধরনের সাহসী কথাবার্তা বলেছেন। বেশ পরিষ্কার করেই বলেছেন, আপাতত তিনি ভারতেই থাকবেন—সেটাও ভারত সরকারের অনুমোদন ছাড়া বলেননি বলেই আমি নিশ্চিত।’
আসলে ভারতের আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনাকে মুখ খুলতে দেওয়া উচিত কিনা—এই বিষয়টি নিয়ে গত পনেরো মাসে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে। বাংলাদেশ বারে-বারেই বলেছে, ভারতের উচিত নয় শেখ হাসিনাকে এমন কিছু বলতে দেওয়া যাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, কিন্তু ভারত সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়নি।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ব্যাংককে এই বিষয়টি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছেও উত্থাপন করেছিলেন, যার জবাবে মোদি জানান ‘এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কারও মুখে লাগাম টানা সম্ভব নয়!’
কিন্তু শেখ হাসিনাকে অনলাইনে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে দেওয়া এক বিষয়, আর আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ‘সাক্ষাৎকার’ প্রকাশ করতে দেওয়া আরেক বিষয়। দিল্লিও অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছেন।
সম্ভবত নিরাপত্তাগত ঝুঁকির কথা ভেবেই ভারত সরকার শেখ হাসিনার ‘মুখোমুখি’ কোনও সাক্ষাৎকার দেওয়াতে এখনও সায় দেয়নি—যে কারণে ওই গণমাধ্যমগুলোকে লিখিত/ই-মেইল সাক্ষাৎকার নিতেই রাজি হতে হয়েছে।
দিল্লিতে বিশ্লেষকরা আরও একটা বিষয় নিয়েও এখন মোটামুটি একমত পোষণ করেছে, আর তা হচ্ছে—আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ তাতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, এই বাস্তবতা শেখ হাসিনাও এখন মেনে নিয়েছেন। এ কারণেই তিনি দলের কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ-বিহীন নির্বাচন তারা যেন সরাসরি বয়কট করেন।
পক্ষান্তরে, ভারতের বাংলাদেশের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ও ঘোষিত অবস্থান হলো—এই নির্বাচন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) ও পার্টিসিপেটরি (অংশগ্রহণমূলক)।
সুলতানা দিনা/