স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতির খবর জানতে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের আজ ঢাকা আসার কথা আছে।
দলটির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা আছে জাতিসংঘের এলডিসি-বিষয়ক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রোনাল্ড মোলেরুস।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের এলডিসি-বিষয়ক দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রোনাল্ড মোলেরুস এবং ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়কারী ডোমেনিকো স্কালপেল্লি আজকের সফরের বিষয় জানিয়ে ২ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীকে চিঠি পাঠিয়েছেন।
মিশনটি আজ ১০ নভেম্বর থেকে তিন ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবে বলে জানা গেছে।
প্রতিনিধিদলটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এসব বৈঠক থেকে পাওয়া তথ্য খতিয়ে দেখবে।
বৈঠক শেষে জাতিসংঘের মিশনটি এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রণয়ন করবে।
বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রভাব বিশ্লেষণ এবং মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন- এ তিন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এই মূল্যায়ন করা হবে।
জাতিসংঘ থেকে এলডিসি উত্তরণের জন্য ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে গত ৮ বছরের বিভিন্ন কাজের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। ৬ বছর পর ২০২৪ সালে এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে কোভিডের কারণে বাংলাদেশকে দুই বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে গত ১৩ মার্চ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে ২০২৬ সালের নির্ধারিত সময়েই বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণে লক্ষ্য নির্ধারণ চূড়ান্ত করে।
এরই মধ্যে দেশের ব্যবসায়ীরা এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এলডিসি থেকে বের হলে রপ্তানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ প্রধান বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারিয়ে রপ্তানি ৬-১৪ শতাংশ কমতে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক কিছু জানায়নি। বরং বেঁধে দেওয়া সময়েই এলডিসি থেকে উত্তরণের পক্ষেই বিভিন্ন বৈঠকে সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকায় আসছে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের এ প্রতিনিধিদলটি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (অর্থ মন্ত্রণালয়) আনিসুজ্জামান চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, জাতিসংঘের বিধিবিধানের কারণে এলডিসি উত্তরণের সময় মানতে আমাদের বাধ্যবাধকতা আছে। উত্তরণ পিছিয়ে দিতে হলে ৯৭ শতাংশ ভোট পেতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) ২৭ দেশের একটাও যদি বিরোধিতা করে, তা সবার বিরোধিতা হিসেবে গণ্য হবে।
এরই মধ্যে ১৬ ব্যবসায়ী সংগঠন গত ২৪ আগস্ট একযোগে সংবাদ সম্মেলন করে এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি করে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সংকট, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি ইতোমধ্যেই গতিশীলতা হারিয়েছে ও প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। এলডিসি থেকে উত্তরণে অন্তত তিন বছরের সময় দেওয়া জরুরি।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসিতে (সিডিপি) সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এ বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর জন্য যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারলে সময় বাড়ানো হতে পারে। প্রস্তুতি নিতে এরই মধ্যে ৮ বছর সময় পেয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রণিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদনের দুটি প্রক্রিয়া আছে। প্রথম প্রক্রিয়াটি হলো, সরকার প্রধানকে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সময় পেছানোর যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে সরাসরি ইকোসকের সিডিপির প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগা করতে হবে। এ এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলো কি অবস্থায় আছে তা জানাতে হবে। বিশেষভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য এসব সূচক মানদণ্ড বজায় রাখাতে ঠিক কতটা সময় প্রয়োজন তা তথ্য প্রমাণসহ তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশের আবেদন পেলে সিডিপি একটি মূল্যায়ন করবে। বাংলাদেশের যুক্তিগুলো ঠিক মনে করলে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানো হবে। অন্যটি বাংলাদেশ সরাসরি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আবেদন করতে পারে। তখন সাধারণ পরিষদই সিদ্ধান্ত নেবে। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভূমিকা রাখতে পারে এমন শক্তিশালী দেশের সহায়তা লাগবে এবং যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘১২ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিনিধিদলটি বৈঠক করবে। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিদলটির মিশনটি আসছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বিষয়টা জাতিসংঘের ওপরই নির্ভর করছে। এর আগে ভুটানের উত্তরণ পরিস্থিতি বিচার করে জাতিসংঘ নিজেই পিছিয়ে দিয়েছিল।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অনুমোদন পেলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি শ্রেণি থেকে বেরিয়ে যাবে। এর আগে ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচকে উত্তীর্ণ হয়ে জাতিসংঘের মানদণ্ডে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এরপর ২০২১ সালে আরেকবার পর্যালোচনা করা হয়। ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)।