বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো রেমিট্যান্সে চলে অর্থনীতির একটি বড় অংশ। প্রত্যেক সরকারই এই রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য মুখিয়ে থাকে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, দালালমুক্ত অভিবাসন, প্রবাসীদের সমস্যা নিরসনে মন্ত্রণালয়ে ডেস্ক চালু, প্রবাসী কার্ড চালুসহ নানা পদক্ষেপ নিতে। কিন্তু তার মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেট প্রস্তাবনায় ৫১ কোটি টাকা কমে যাওয়ায় মন্ত্রী হতাশ হয়েছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য ৮৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আর চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের বরাদ্দের চেয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে ৫১ কোটি টাকা কম দেওয়া হয়েছে।
শ্রমবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে এখন জেনেভায় অবস্থান করছেন মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার ফোনে খবরের কাগজকে তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়ানো দরকার। সেখানে চলতি বাজেটের তুলনায় ৫১ কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়ায় প্রস্তাবে অবাক হয়েছেন তিনি। দেশে ফিরে তিনি এ বিষয়টি দেখবেন এবং বাজেট অধিবেশনে সেটা বাড়ানোর প্রস্তাব করবেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, এটি প্রস্তাবিত বাজেট, তাই বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
এদিকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। এক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাও সরকারের লক্ষ্য। নুর বলেছেন, এই সেক্টর নিয়ে বাজেট বক্তৃতায়ও নানা উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ ও প্রবাসী বাংলাদেশি জনশক্তির সুরক্ষা ও কল্যাণে আমাদের সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার একটি বিশেষ ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তন করছে। প্রবাসী কল্যাণ সেবা, বিমা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং জরুরি সহায়তার সঙ্গে কার্ডটি সংযুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, বিকল্প শ্রমবাজার হিসেবে আমরা রাশিয়া, পর্তুগাল, রোমানিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস, সার্বিয়া, নর্থ মেসিডোনিয়া–এই দেশগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আমরা আবারও মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। আমাদের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরের মাসেই অর্থাৎ গত মার্চে প্রবাসীদের পাঠানো মাসিক রেমিট্যান্স ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ।
রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আমরা আশা করছি এই ধারা অব্যাহত থাকবে। সরকার প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা অব্যাহত রাখছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শ্রম বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে পেশাভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। বিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এমন খাতগুলোর জন্য খাতভিত্তিক কোর্স এবং পাঠ্যক্রম চালুর কাজ শুরু করেছে। বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন, সার্টিফিকেশন, অ্যাক্রেডিটেশন ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে। অর্থ বিভাগের অধীনে ‘স্কিল ফর ইন্ডাস্ট্রি কমপিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রাম’-এর আওতায় প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার জনকে শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক মাঝারি হতে উচ্চতর দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশি শ্রমিকপ্রধান দেশের দূতাবাসগুলোতে বিদেশে বিপদগ্রস্ত কর্মীদের সুরক্ষায় ‘বাংলাদেশ সাপোর্ট সেন্টার’ স্থাপন করা হবে। এসব সেন্টার জেলে থাকা, নিগৃহীত বা প্রতারিত কর্মীদের উদ্ধার, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজা এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধে আইনি সহায়তা প্রদান করবে। এ ছাড়া দেশে ফেরত প্রবাসীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনে নানামুখী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। বিদেশে মৃত্যুবরণকারী প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মরদেহ সম্মানের সঙ্গে দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া সহজতর করা হবে।
‘ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল করা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যমান ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) কার্যক্রম জোরদার করা হবে এবং আরও ৫০টি উপজেলায় নতুন ৫০টি টিটিসি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ জনকে দক্ষ ড্রাইভার হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে ইউরোপ, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীদের সহজ শর্তে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া অব্যাহত থাকবে এবং এ কার্যক্রমের আওতা আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।