জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ অজ্ঞাতনামা ১১৪ জনের পরিচয় শনাক্তে মরদেহ উত্তোলনের কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রবিবার (৭ ডিসেম্বর) প্রথম দিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান থেকে দুজনের মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করে মরদেহ দুটি পুনঃদাফন করা হয়।
মরদেহ উত্তোলনের আগে সকাল ১০টার দিকে সংবাদ ব্রিফিং করেন সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ছিবগাত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যারা দেশের জন্য রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বুকের রক্ত দিয়েছে, তাদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। এই কবরস্থানে যারা অজ্ঞাত হিসেবে শুয়ে আছেন, তাদের পরিচয় ওই সময় যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এখন তাদের পরিচয় উদঘাটন করে জাতির কাছে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। আজ সেই মহান কাজের সূচনা হবে।’
সিআইডি প্রধান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ স্যাম্পলিংসহ প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হবে। আবেদন অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১১৪টি কবর চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কম-বেশি হতে পারে। মরদেহ উত্তোলনের পর ময়নাতদন্ত, বোন স্যাম্পল/টিস্যু সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হবে। পরিচয় নিশ্চিত হলে ধর্মীয় সম্মান বজায় রেখে আবার পুনঃদাফন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আর্জেন্টিনার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুয়িস ফনডিব্রাইডার পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি গত ৪০ বছরে ৬৫টি দেশে একই ধরনের অপারেশন পরিচালনা করেছেন।’
গতকাল সকালে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দেখা গেছে, শহিদদের গণ-কবরের স্থানটি চারপাশ কাপড়ের বেষ্টনী এবং হলুদ রঙের ক্রাইমসিন ফিতা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। ভেতরে রয়েছে মাটি খোঁড়ার বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং একটি ‘হ্যান্ড স্ট্রেচার’। এর বাইরে শহিদদের পরিবারের সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন। এদিকে লুইস ফনডিব্রাইডারসহ সিআইডির দলটি পুরো স্থানটি ঘুরে দেখেন। এরপর সিআইডির সদস্যরা মরদেহ উত্তোলনের জন্য মাটি খোঁড়া শুরু করে। কবরের পাশেই তাঁবুর তৈরি অস্থায়ী ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা ছিল। প্রথম দিনে দুটি কবর খুঁড়ে দুইজনের মরদেহ উত্তোলন করা হয়েছে। তাদের ময়নাতদন্ত, ডিএনএ স্যাম্পলিং সংগ্রহ শেষে পুনঃদাফন করা হয়।
সিআইডি প্রধান আরও বলেন, ‘মরদেহ উত্তোলন থেকে পোস্টমর্টেম, বোন বা টিস্যু সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি– প্রতিটি ধাপে সব স্টেকহোল্ডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ডিএমপি ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই কাজে যুক্ত আছেন।’
এখন পর্যন্ত কতজনের মরদেহ উত্তোলনের আবেদন পেয়েছেন- জানতে চাইলে সিআইডিপ্রধান বলেন, এ পর্যন্ত ১০ জনের স্বজন আবেদন করেছেন। যদি আরও কেউ আবেদন করতে চায়, তবে সিআইডিতে যোগাযোগ করতে পারবেন। সিআইডি হটলাইনে যোগাযোগ করলে স্বজনদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করা হবে। পরিচয় শনাক্তের পর কেউ যদি মরদেহ নিতে চান, তবে নিতে পারবেন।’
এই কাজে কতদিন সময় লাগবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি না, কোন কবরে কে আছেন। এই কাজে সময় কত লাগবে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে এতটুকু বলতে পারি, এ প্রক্রিয়ায় সব শহিদের পরিচয় আমরা বের করতে পারব।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে সিআইডিপ্রধান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী মরদেহের কোনো ছবি বা সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। এটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট কাজ। এই কাজে গণমাধ্যমের পূর্ণ সহযোগিতা চাই।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে আর্জেন্টিনার ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট লুইস ফনডিব্রাইডার বলেন, ‘তিন মাস ধরে সিআইডির সঙ্গে কাজ করছি। আমি নিশ্চিত করছি, আন্তর্জাতিক ফরেন্সিক মানদণ্ড ও প্রটোকল মেনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।