দেশের চলমান রাজনৈতিক ও শাসন সংকট থেকে উত্তরণে একটি সুষ্ঠু, কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, নির্বাচন এখন আর কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি।
১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪- একই ধারার আন্দোলন
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, এই তিন সময়ের চেতনার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। সামাজিক সুবিচার, মানবিক মর্যাদা ও বৈষম্যবিরোধী আকাঙ্ক্ষাই এই তিন সময়ের আন্দোলনের অভিন্ন সূত্র।
তার মতে, আন্দোলন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশ রাষ্ট্র সংস্কারের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।
তিনি বলেন, বিচার, নির্বাচন, সংস্কার ও নাগরিক অধিকার- এই চারটি বিষয় এখন রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে এসেছে। এই বাস্তবতায় সামনে আসা জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে- এই নির্বাচন কার কথা বলবে, কার কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রচিন্তায় স্থান পাবে।
সুষ্ঠু হলেও নির্বাচন কি অর্থবহ হবে?
ড. দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না- এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি গভীর প্রশ্ন সামনে এসেছে। তা হলো, নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও তা কি অর্থবহ হবে? এই নির্বাচনের মাধ্যমে কি সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে, নাকি দেশ আবারও পুরনো গড্ডালিকা প্রবাহে ফিরে যাবে- এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, পিছিয়ে পড়া ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর আগামী দিনের রাষ্ট্রচিন্তায় স্থান পাবে কি না- এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
দীর্ঘদিনের শাসন সংকটের পটভূমি
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গত দেড় দশকে মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা গভীর শাসনতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এরই পরিণতিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। এটি ছিল কর্তৃত্ববাদ, ভয়ভীতি ও জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও জোরালো প্রতিবাদ।
নির্বাচনী ইশতেহারে কি নাগরিক প্রত্যাশা প্রতিফলিত হবে?
সংলাপে তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন- সামনের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে কি নাগরিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে? নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবায়িত হবে? পরিবর্তনের আলোচনায় কারা অন্তর্ভুক্ত হবে, আর কারা আবারও উপেক্ষিত থেকে যাবে?
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রবন্ধে বলা হয়, গত দেড় দশকের শাসন সংকট, বৈষম্য ও বঞ্চনার পুঞ্জীভূত বাস্তবতা থেকেই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম। এই অভ্যুত্থান একটি স্পষ্ট উপলব্ধি সামনে এনেছে- এটাই সময় অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের।
নাগরিক প্ল্যাটফর্ম জানায়, দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে আঞ্চলিক পরামর্শ সভা, ১৫টি যুব কর্মশালা এবং অনলাইন মতামত সংগ্রহের মাধ্যমে ৩৫টি জেলার প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের দেড় শতাধিক সহযোগী সংগঠন যুক্ত ছিল।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনা শেষে ‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’- এই প্রশ্নে উপস্থিতদের মতামত নেওয়া হয়।
সংলাপে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এলিস/অমিয়/