শপথ নেওয়ার ছয় দিনের মাথায় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ তিন সচিবকে প্রত্যাহার করে আদেশ জারি করেছে সরকার।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবসহ (সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন) তিন সচিবকে তাদের নিজ পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
প্রত্যাহার করা সচিবরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর আদর্শিক একাধিক কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন।
এদিকে গতকাল রাতেই ৯টি পৃথক আদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ৯ কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গতকাল প্রজ্ঞাপন জারির পরই (রাত ১০টা ১২ মিনিট) প্রশাসনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. সাইফুল্লাহ পান্না এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন বিশেষ এই গোষ্ঠীর আদর্শিক কর্মকর্তা বলে প্রশাসনে পরিচিত ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরই অন্তর্বর্তী সরকার ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ২০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে অবসরে যাওয়া প্রশাসনের ২০ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে তার পরিবর্তে মো. মোখলেস উর রহমানকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় সরকার। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট মো. মোখলেস উর রহমানকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগের পর পরই মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত হন মোখলেস উর রহমান। অবশিষ্ট সময়ে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি-পদায়ন নিয়ে ক্রমাগত অভিযোগ ওঠায় অবশেষে তাকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। গতকাল চুক্তির অবশিষ্ট সময়ও এবার বাতিল করল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠনের আগ মুহূর্তে জনপ্রশাসনের দুটি শীর্ষ পদের দুজন কর্মকর্তা নিজে থেকে সরে গেছেন। একজন হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ, অন্যজন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। এরপর চুক্তিতে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা অন্য সচিবরা হলেন জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির (এনএপিডি) মহাপরিচালক (সিনিয়র সচিব) সিদ্দিক জোবায়ের, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মোহাম্মদ ইউসুফ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মিজ মমতাজ আহমেদ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ এবং বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক (সচিব পদমর্যাদার) বেগম শরীফা খান।
সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনে আরও পরিবর্তন আসছে। এ ক্ষেত্রে খালি হওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ চারটি সচিবের পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে গতকাল প্রত্যাহার করা তিন সচিবের পদ সহসাই পূরণ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তার পুরো সময়ে বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। তাই সরকারের আগ্রহ অনুসারে মাঠ প্রশাসনের এসব পদেও দ্রুতই পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে প্রশাসনে পুলিশ বাহিনীতে পরিবর্তন আসছে বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সূত্র জানায়, সামগ্রিক পরিবর্তন নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলাপ-আলোচনা চলছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়। প্রথম ছয় মাসেই সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে ১৪ জন, গ্রেড-১ পদের ১ জন ও অতিরিক্ত সচিব পদের ১৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। একই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদের ২৩ জন, গ্রেড-১ পদের ২ জন ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ৫১ কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। এর পরও আরও বেশ কিছু কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।
ক্ষমতাসীন বিএনপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা হবে।