ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীবাসী ট্রেন ও লঞ্চে নির্ঝঞ্ঝাটে বাড়ি ফিরতে পারলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে বিপাকে পড়েছেন বাসযাত্রীরা।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল থেকে যাত্রীদের ভিড় জনস্রোতে রূপ নিলেও ট্রেনের শিডিউল ঠিক থাকায় স্বস্তিতেই ফিরছেন ঘরমুখী মানুষ। প্রতিটি ট্রেনই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে স্টেশন ছেড়েছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীর চাপ বেড়েছে।
লঞ্চের মালিকরা বলছেন, পদ্মা সেতুর প্রভাবে যাত্রী কমলেও ঈদের সময় বাসের বাড়তি ভাড়া থেকে মুক্তি পেতে এবং আরামদায়ক ভ্রমণের আশায় অনেকেই এখনো নৌপথকে বেছে নিচ্ছেন। এদিকে বাসস্ট্যান্ডগুলোতে আজ খুব বেশি ভিড় দেখা না গেলেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
রেলযাত্রায় স্বস্তি
শেষ কর্মদিবসের পর নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের স্রোত নেমেছে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ট্রেনই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে স্টেশন ছাড়ছে। সকাল ৬টায় রাজশাহীগামী ‘ধূমকেতু এক্সপ্রেস’ দিয়ে শুরু হয় দিনের ঈদযাত্রা। এরপর নীলসাগর, সুন্দরবন, এগারো সিন্দুর প্রভাতী ও তিস্তা এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়েই গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদযাত্রার পঞ্চম দিনে আজ মোট ৬০টি ট্রেন ঢাকা ছেড়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি আন্তনগর এবং বাকিগুলো লোকাল ও স্পেশাল ট্রেন।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম জানান, গত ৭ মার্চ যারা টিকিট কেটেছিলেন তারা আজ ঢাকা ছেড়েছেন। জয়দেবপুর ও ঢাকা থেকে একটি করে স্পেশাল ট্রেনও ছিল। যাত্রীদের চাপ সামলাতে বেশির ভাগ ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ যুক্ত করা হয়।
বিনা টিকিটে ভ্রমণ ঠেকাতে এবার তিন স্তরের নিরাপত্তা ও চেকিং ব্যবস্থা নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। স্টেশনে প্রবেশের মুখে দুই দফা টিকিট পরীক্ষা করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ টিটিই আফতাব জানান, টিকিট ছাড়া কাউকে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে পরিবারের সদস্যের তুলনায় টিকিট কম থাকলে জরুরি ভিত্তিতে স্ট্যান্ডিং টিকিটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে।
বাসযাত্রায় বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধ হচ্ছে না
মঙ্গলবার সকালে গাবতলী ও কল্যাণপুর টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীরা আসতে শুরু করলেও তা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। অনেক কাউন্টার মাস্টারকে হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজতে দেখা গেছে। তবে যাত্রীচাপ কম থাকলেও বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন যাত্রীরা।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়া এবং ট্রেনের প্রতি ঝোঁক বাড়ায় গাবতলীতে যাত্রী কমেছে। তবে যাত্রী সাধারণের অভিযোগ, তাৎক্ষণিক টিকিট কাটতে গেলে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাবি করা হচ্ছে।
সকালে গাবতলী টার্মিনাল পরিদর্শন করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। অবৈধ বাস কাউন্টার ও বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিআরটিএর ভিজিল্যান্স টিম ও আমাদের কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে।’
টার্মিনালগুলোতে বিআরটিএর পক্ষ থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। বিআরটিএর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সাহা জানান, ভাড়ার তালিকা টানানো নিশ্চিত করা হয়েছে এবং অভিযোগ পাওয়ামাত্রই জরিমানা করা হচ্ছে।
তবে আইজিপি চলে যাওয়ার পর পরিবহন শ্রমিকরা ফের বাড়তি ভাড়া আদায় করতে শুরু করেন। বিআরটিএর ঢিলেঢালা অভিযানে অনেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে এক যাত্রী বিআরটিএর অস্থায়ী বুথে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দায়িত্বশীল কাউকে পাননি।
একই চিত্র দেখা গেছে মহাখালী আন্তজেলা বাস টার্মিনালেও। মহাখালী আন্তজেলা টার্মিনাল বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আংশিক সত্য। যাত্রীরা এসে অভিযোগ জানালে আমরা বাড়তি ভাড়ার টাকা ফেরত দিচ্ছি। তবে সব বাস মালিক জোর করে বাড়তি টাকা আদায় করছেন, এই অভিযোগ মেনে নিতে পারব না।’
সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ীর বাস কাউন্টারগুলোতে বরিশাল-ফরিদপুর রুটের কিছু বাসে মালপত্র ও আসন বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় রাঙ্গামাটি নদীর ওপর নির্মিত গোমা সেতু উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, ঈদুল ফিতরে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বেন। তাদের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তাই ঈদযাত্রায় মহাসড়কের যানজট হতে পারে–এমন ২০৭টি স্পটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাইওয়ে ও ব্রিজেও মনিটরিং করা হচ্ছে।
শেষ বিকেলে সদরঘাটে উপচে পড়া ভিড়
মঙ্গলবার বিকেলে অফিস ছুটির পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। সদরঘাটের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে আজ থেকে বছিলা ও শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু করেছে বিআইডব্লিউটিএ।
সদরঘাট ঘুরে দেখা যায়, মূলত চাঁদপুরগামী লঞ্চগুলো নিয়মিত ছেড়ে গেছে। তবে বিকেল ৫টার পর থেকে বরিশাল, ভোলা, বরগুনা ও ঝালকাঠিগামী লঞ্চগুলোতে ভিড় বাড়তে শুরু করে। লঞ্চের মালিকরা বলছেন, পদ্মা সেতুর প্রভাবে যাত্রী কমলেও ঈদের সময় বাসের বাড়তি ভাড়া ও আরামদায়ক ভ্রমণের আশায় অনেকেই এখনো নৌপথকে বেছে নিচ্ছেন।
মঙ্গলবার সকাল ৭টায় বছিলা ঘাট থেকে ১০০ থেকে ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে ভোলার হাকিমুদ্দিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায় প্রথম লঞ্চ ‘এমভি টিপু’। তবে প্রচারের অভাবে বিকল্প এই ঘাটে প্রত্যাশিত যাত্রী মিলছে না বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। সকাল ৯টায় শরীয়তপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ‘এমভি ইমাম হাসান-৫’ লঞ্চে মাত্র চারজন যাত্রী দেখা গেছে।
বিআইডব্লিউটিএর পরিদর্শক মামুনুর রশীদ জানান, মোহাম্মদপুর, সাভার ও মিরপুর এলাকার যাত্রীদের সুবিধার জন্য এই ঘাটটি চালু করা হয়েছে। প্রচার বাড়লে যাত্রীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, এবার প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ নদীপথে যাতায়াত করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি লঞ্চে জরুরি হটলাইন নম্বর প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।