ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর এবার সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ৬ এপ্রিল নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আজ ৮ এপ্রিল এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে সংস্থাটি। এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ১২ মে নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে করতে কমিশনের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব বাছাই করার এই নির্বাচনে সরাসরি ভোটারদের অংশগ্রহণ না থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরণ ও জোট রাজনীতি এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইসি সচিব জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে জোটগত অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে বেশির ভাগ দল তাদের অবস্থান জানিয়েছে। সেই তথ্য অনুযায়ী, এবার বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পৃথক জোটে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে জোটে রয়েছে গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জোট গড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে।
অন্যদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরাও একটি আলাদা মোর্চা গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে সব স্বতন্ত্র সদস্য একই জোটে থাকছেন না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জানিয়েছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে তিনি জোটে থাকছেন না। একইভাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালাও কোনো জোটে থাকবেন না।
সংবিধান অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সেটা হলো এসব আসনের নির্বাচন সরাসরি ভোটারদের অংশগ্রহণে হয় না। সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাই এই ভোটে অংশ নেন। সংসদে কোনো দল যতটি সাধারণ আসনে বিজয়ী হয়েছে, সেই সংখ্যা ৫০ দিয়ে গুণ করে ৩০০ দিয়ে ভাগ করলে যে ফল পাওয়া যায়, সেটিই ওই দলের সংরক্ষিত নারী আসনের আনুপাতিক সংখ্যা হিসেবে নির্ধারিত হয়। তবে সংসদের প্রকৃত আসনসংখ্যা, উপনির্বাচন বা অন্য পরিস্থিতির কারণে এই হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট হয় ২৯৯টি আসনে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়। অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল স্থগিত রয়েছে। ফলে ২৯৭টি আসনের ফল প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এই ফলের ভিত্তিতে সংসদে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুটি আসনে জয়ী হওয়ার পর বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দিলে বর্তমানে সংসদে বিএনপির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০৮ জনে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২টি আসন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ১টি আসন। একইভাবে গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং গণসংহতি আন্দোলন, প্রতিটি দল একটি করে আসন পেয়েছে। অন্যদিকে ৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
এদিকে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনের জন্য গত ৬ এপ্রিল ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে ইসি। ত্রয়োদশ সংসদে বর্তমানে সংসদ সদস্য রয়েছেন ২৯৬ জন। ফলে এবার সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে ভোটার এসব এমপি ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর প্রতিনিধিত্ব চূড়ান্ত করবেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সাধারণ আসনের মতো সরাসরি ভোটে হয় না। সংসদের নির্বাচিত সদস্যরাই এই ভোটে অংশ নেন। ফলে সংসদে যে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি, তাদের জন্য নারী আসনে বেশি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে অংশ নেবেন সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর এমপিরা। জাতীয় নির্বাচনে তাদের সংসদীয় আসন প্রাপ্তির আনুপাতিক হার অনুযায়ী এই সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা হবে। সংসদে যে দলের প্রতিনিধিত্ব বেশি, তাদের জন্য সংরক্ষিত নারী আসনে বেশি প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে নারী আসনের সম্ভাব্য বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার আসনসংখ্যার আনুপাতে সংসদে সবচেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে বিএনপি। ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট প্রায় ৩৬টি আসন পেতে পারে। আর জামায়াত-এনসিপি জোট পেতে পারে ১২টি আসন। বাকি ২টি আসন স্বতন্ত্র বা ছোট দলগুলোর ভাগে যেতে পারে। তবে এই হিসাব চূড়ান্ত হবে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল এবং প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই শেষে। দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করে প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন শুধু আনুপাতিক হিসাবের বিষয় নয়; বরং এটি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। কারণ এসব আসনে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরেও নানা সমীকরণ তৈরি হয়। অনেক সময় দলীয় সিনিয়র নেতাদের পরিবার, নারী সংগঠনের নেত্রী কিংবা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিরা এসব আসনের জন্য মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন। ফলে দলগুলোর ভেতরেও নানা সমীকরণ ও আলোচনার জন্ম দেয় এই নির্বাচন।’
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের পর বিজয়ী সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সে কারণে তফসিল ঘোষণার পর অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো নির্বাচন-প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সাধারণ নির্বাচনের পর এবার সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণেও জোট রাজনীতি, দলীয় কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে তফসিল ঘোষণার পর এই নির্বাচনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।