চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের মাঝে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। একটি অসাধু চক্র গুজব ছড়িয়ে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্টের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট অনুসন্ধানে এসব তথ্য বিষয় বেরিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি, একাধিক ভিডিওতে দাবি করা হয় এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে। বিশেষত, পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে এসে পরীক্ষার আগের রাতের কিছু মেসেজ গ্রুপটিতে দেখতে পান, যেখানে প্রশ্ন দেওয়া ছিল। মেসেজগুলোয় কোনো Edited লেভেল না থাকা অনেকেই বিষয়টিকে সত্য হিসেবে ধরে নিয়ে সমালোচনায় অংশ নেন।
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে, আলোচিত দাবিটি ভুয়া। টেলিগ্রামের গ্রুপটিতে বট আইডির মাধ্যমে পূর্বে দিয়ে রাখা মেসেজ পরীক্ষার পরে প্রশ্নের ছবি সম্পাদনার মাধ্যমে যুক্ত করে এই গুজবটি প্রচার করা হয়। বট আইডির ক্ষেত্রে edited লেভেল দেখা না যাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রতারণার কৌশল বেছে নেন।
গত ২৫ এপ্রিল ‘সময় টেলিভিশন’ এক ভিডিও প্রতিবেদনে দাবি করে এসএসসির প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে টেলিগ্রামে৷ একজন পরিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে বলা হয়, টেলিগ্রামে ‘সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬’ নামের একটি গ্রুপে টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্ন দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। ভিডিওতে ওই শিক্ষার্থী বলছিলেন, “পরীক্ষার আগের দিন গ্রুপে মেসেজ দিয়েছিল যে আজ রাত ১১ টার দিকে প্রশ্ন দেওয়া হবে।” পরে তিনি রাতে গ্রুপে দেখেন, প্রশ্ন দেওয়া হয়নি। বলেছে যে, কোনো এক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রশ্ন দিতে পারছে না।
ওই শিক্ষার্থী জানান, পরের দিন পরীক্ষা দিয়ে আসার পর ওই গ্রুপে গিয়ে দেখেন, ওই চ্যানেলে আরেকটা চ্যানেলের লিংক দেওয়া আছে। ‘সকল বোর্ড প্রশ্ন ২০২৬’ নামের ওই গ্রুপে তিনি দেখতে পান, ২০ এপ্রিল রাত ১১ টা ২৪ মিনিটে তাদের দিনাজপুর বোর্ডের প্রশ্ন দেওয়া আছে। তিনি তখন মিলিয়ে দেখেন তাদের প্রশ্নের সাথে হুবহু মিল রয়েছে টেলিগ্রামে থাকা প্রশ্নটির। পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিলের বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষার আগে প্রশ্ন দেওয়ার প্রলোভনে টাকা দাবি করা হয় গ্রুপে।
এই পরীক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। তবে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় তার পরিচয় প্রকাশ করা হলো না। তার ফেসবুক প্রোফাইলে এক ভিডিওতে ২৩ এপ্রিল তিনি এ বিষয়ে প্রথম অভিযোগ করেন। তিনি ভিডিওতে একটি বিকাশ নাম্বারের বিষয়ে বলেছেন যেটি Tarin Sultana Tori নামে একটি ভেরিফাইড প্রোফাইল থেকে তাকে দেওয়া হয়েছিল। এই চক্রটি প্রশ্ন প্রতি ৬০০০ টাকা চাচ্ছিলো এই আইডি থেকে।
ওই পরীক্ষার্থীর টেলিগ্রাম আইডি থেকে Ismail Hossain Prince নামের এক ব্যক্তিও ২৪ এপ্রিল একই দাবি সংক্রান্ত ভিডিও বানিয়ে পোস্ট করেন।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম টাইমস টুডে’তেও ইংরেজি ১ম পত্র পরীক্ষার দিন এক পরীক্ষার্থী দাবি করেন যে, তিনি দুই হাজার টাকা দিয়ে প্রশ্ন পেয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে ‘সময় টিভি’কে সাক্ষাৎকার দেওয়া আলোচিত সেই পরীক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার। তিনি জানান, তারা কয়েকজন বন্ধু মিলে বাংলা ২য় পত্র পরীক্ষার প্রশ্ন পেতে টাকা জোগাড় করে টেলিগ্রাম গ্রুপটিতে দেওয়া একটি বিকাশ নাম্বারে ১১ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। তবে টাকা পাঠানোর পর তাদের সেখান থেকে প্রশ্ন না দিয়েই ব্লক করে দেওয়া হয়। “তবে, যতদূর সম্ভব ওখানে ১৪০ অব্দি সিরিয়াল নাম্বার ছিলো। কিন্তু হাতে গনা কয়েকজনকে ব্যন্ড করা হয়েছিলো।” তিনি কোনো পরীক্ষারই আগের রাতে গ্রুপটিতে প্রশ্ন দেখেননি বলে জানান। শুধু পরদিন পরীক্ষা দিয়ে এসে গ্রুপে প্রশ্ন দেখতে পান।
টাইমস টুডে এর ভাইরাল ভিডিওতে যে পরীক্ষার্থীকে টাকা দিয়ে প্রশ্ন পাওয়ার দাবি করতে দেখা যায় তার পরিচয়ও খুঁজে বের করেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। রাজধানীর একটি স্কুলের এই শিক্ষার্থীর এক সহপাঠী রিউমর স্ক্যানারের কাছে দাবি করেন, তার বন্ধু কোনো প্রশ্ন পায়নি। ভিডিওতে সে মজা করে এমন বলেছিল।
অর্থাৎ, যে ভিডিওগুলো থেকে প্রশ্ন ফাঁসের দাবিটি ছড়িয়েছে সেই ভিডিওতে যারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে কোনো প্রমাণ পাননি।
সময় টিভির প্রশ্নফাঁসের দাবি সংক্রান্ত ভিডিও প্রচারের প্রেক্ষিতে চারদিকে আলোচনার পরপরই টেলিগ্রাম গ্রুপটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে গ্রুপটির লিংক (https://t.me/sscposno) নানা অনুসন্ধানের পর খুঁজে পায় রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট৷ এই গ্রুপটির প্রচারণা কীভাবে চালানো হয়েছে তা জানতে ফেসবুকে ইউজার নেমটি সার্চ করে ‘Ssc 2026 প্রশ্ন ফাঁস গ্রুপ’ নামের একটি গ্রুপে অন্তত ২১ এপ্রিল থেকে পরিচয় গোপন রেখে নিয়মিত টেলিগ্রাম গ্রুপটির প্রচারণা চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সময় টিভির ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়ার পর এক পর্যায়ে সেদিনই ভিডিওটি সরিয়ে নেয় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে এক বিবৃতিতে সময় জানায়, প্রশ্নফাঁস সম্পর্কিত প্রতিবেদনটিতে কিছু ত্রুটি ও ঘাটতি থাকায় তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের সামগ্রিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়, এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের দাবিটি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা। কৌশল কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।