দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে সংক্রামক রোগ হাম। প্রতিদিনই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনের হাম শনাক্ত হয়েছিল। শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতিকে ‘জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
- এক দিনে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ১১, মোট প্রাণহানি ৩৯৮ শিশুর
- প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সব ছুটি বাতিল
- নিঃসন্দেহে হাম এখন ‘মহামারি’ আকার ধারণ করেছে, সরকারের পক্ষ থেকে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করা প্রয়োজন: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর চাপ। শয্যাসংকটে হাসপাতালের বারান্দা, ফ্লোর এমনকি সিঁড়িতেও চলছে শিশুদের চিকিৎসা। হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
মহামারির দিকে হাম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৩৯৮ জন। এর মধ্যে ৭৭ জনের হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, একই সময়ে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৬৪ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ১১৫ জন এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ১১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এখানে এক দিনেই ৫৪৪ জন সন্দেহজনক রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩০ জন এবং বরিশালে ১৪৭ জন। নিশ্চিত হাম শনাক্তের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ ৫৪ জন রোগী পাওয়া গেছে।
হাসপাতালে করুণ অবস্থা
রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। দুই মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হয়ে কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বেডে। চিকিৎসকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখেননি তারা। একজন আক্রান্ত শিশুর শরীর থেকে অন্য শিশুর শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতগতিতে। হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট এতটাই তীব্র যে অনেক শিশুকে ফ্লোরে, বারান্দায়, এমনকি টয়লেটের সামনেও বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুমৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, অপুষ্টি, ঘনবসতি এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। হাম এখন নতুন করে প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে অনেক শিশু বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে বড় একটি জনগোষ্ঠী এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা আরও জানান, হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা যুক্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। সময়মতো টিকা ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে এই মৃত্যুর বড় অংশ প্রতিরোধ সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।
পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ ঘোষণা দাবি
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)। গত শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত ‘হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা তা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেটিকে জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি বলা হয়। বর্তমানে দেশে হামের বিস্তার সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হামকে ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। গতকাল বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতিকে ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ বা মহামারি হিসেবে ঘোষণা, সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ফ্রি আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করা, জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার এখন জরুরি অবস্থায় রূপ নিয়েছে। শিশুদের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বক্তারা বলেন, জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করে সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ফ্রি আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে টিকা কার্যক্রমে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
দেশে হাম পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই মহামারি আকার ধারণ করেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, নিঃসন্দেহে হাম এখন ‘মহামারি’ আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর পরামর্শ নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে সংক্রমণ যেন আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হামের প্রাদুর্ভাবে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাতিল
এদিকে হামের কারণে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়তে থাকায় জরুরি ব্যবস্থা নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অধিদপ্তর ও এর আওতাধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, আপৎকালীন নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের লক্ষ্যে অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি স্থগিত করা হয়েছে। নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, কোরবানির ঈদের পর সারা দেশে হামের টিকার দ্বিতীয় ধাপের ক্যাম্পেইন শুরু হবে। মন্ত্রী বলেন, মাসিক চাহিদা অনুযায়ী সিরিঞ্জের কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাম নিয়ে রাজনীতি, অভিযোগের তির ইউনূসের দিকে
হাম পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতিতে হামসহ ১১টি টিকার বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় ‘ওটি’ কার্যক্রমও পরিচালিত হয়নি। ফলে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। হামে শিশুমৃত্যুর জন্য ড. ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিচারের দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভও হয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমান বিএনপি সরকারও এই সংকটের দায় আগের ইউনূস সরকারের ওপর চাপাচ্ছে। গত রবিবার এক সেমিনারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ মায়েদের পুষ্টিহীনতা। বিভিন্ন হাসপাতালে পরিদর্শনে গিয়ে তিনি জেনেছেন, অনেক মা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো অবস্থায় নেই। তাই মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টকশোগুলোতে শুরু হয়েছে সমালোচনা। একই সঙ্গে এনসিপির নেতারাও হাম মোকাবিলায় বিএনপি সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। শনিবার এক আলোচনা সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার হাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে আগের সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে। দ্রুত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে কয়েকটি হাসপাতালকে শুধু হামের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করার দাবিও জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোশতাক হোসেন সাংবাদিকেদের বলেন, দেশে হামে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার বড় কারণ দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। তার ভাষায়, ‘আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা মাথা ভারী হয়ে গেছে। সবাই শুধু বড় বড় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়তে চান। কিন্তু ইউনিয়ন ও গ্রামপর্যায়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে সামান্য অসুস্থতাতেও মানুষকে ঢাকায় ছুটতে হয়। করোনার পর মানুষের আর্থিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে। খাবারের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে। এতে মা ও শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাচ্ছে, আর বাড়ছে মৃত্যুহার।