রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের একটি জরিপে দেখা গেছে রাজধানীতে নির্মিত ভবনগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশই করা হয়েছে অনুমোদিত নকশার বাইরে। যা নগরবাসীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এর ফলে বড় মাত্রার কোনো ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকায় নেমে আসতে পারে চরম বিপর্যয়। বিশেষ করে জনবহুল এলাকাগুলোতে রাজউকের অনুমোদন লঙ্ঘন করে কিংবা ছোট রাস্তাকে বড় দেখিয়ে নকশার অনুমোদন নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স বা উদ্ধারকারী দলের পক্ষে দুর্গত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কাগজে-কলমে আইন, বাস্তবে অকার্যকর
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি-২০২০), ঢাকা মহানগরীর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ এবং ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানসহ (ড্যাপ) একাধিক শক্ত নীতিমালা ও বিধান রয়েছে। তবে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ–রাজনৈতিক প্রভাব, রাজউকসহ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাবে এসব নীতি বাস্তবে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা সাধারণ নগরবাসীকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকির মুখে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও দালালচক্র ভবনের অনুমোদন নেওয়ার সময় প্লটের আশপাশে প্রস্তাবিত ২০ বা ৩০ ফিট রাস্তা দেখিয়ে রাজউকের ছাড়পত্র নেয়। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদের জায়গা থেকে রাস্তার জন্য এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ে না।
রাজউক জোন-৬: অনিয়মের আখড়া মাতুয়াইল-মুসলিমনগর
রাজধানীর রাজউক জোন-৬ এর অন্তর্ভুক্ত মাতুয়াইল, মুসলিমনগর, শান্তিবাগ, বাদশা মিয়া রোড, মধুবাগ, কলেজ রোড এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সরেজমিনে দেখা গেছে নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের হিড়িক। বাদশা মিয়া রোডের উত্তর দিকে দুটি নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে, যেখানে ‘সেট ব্যাক’ (ভবনের চারপাশে বাধ্যতামূলক খালি জায়গা) কিংবা ‘ফারের’ (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। চিটাগং রোড দিয়ে কলেজ রোডে ঢুকতেই ডানদিকের একটি নির্মাণাধীন ভবনে সাইনবোর্ডে অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো তথ্যই ঝোলানো নেই। খালি চোখেই সেখানে দৃশ্যমান নানা অনিয়ম। এর কিছুটা সামনে দক্ষিণে ‘কাজী রিয়েল এস্টেটের’ একটি বহুতল ভবন নির্মিত হলেও পথচারীদের সুরক্ষায় কোনো সেফটি নেট বা নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মুসলিমনগর ৩ নম্বর রোডে নির্মাণাধীন একটি ভবনেও মিলল একই চিত্র। সেখানে কোনো তথ্য নেই, এমনকি ‘সেট ব্যাক’ রুলস কী- তা ভবন মালিক জানেন কি না সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মুসলিমনগর ২ নম্বর রোডে নির্মাণ অনুমোদনের নিয়ম না মেনে এবং রাস্তার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না ছেড়েই ফরাজী টাওয়ারের কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নানা অনিয়মের কারণে রাজউক থেকে কাজ বন্ধের ও পরবর্তীতে ভবন ভাঙার অফিশিয়াল নোটিশ দেওয়ার পরও তোয়াক্কা করছেন না ক্ষমতাসীন ব্যবসায়ী শাহজাহান ফরাজী। সরেজমিনে দেখা যায় কাউকে পরোয়া না করে অদ্যাবধি তিনি বেজমেন্টের নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছেন।
চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ, সুরাহা মেলেনি
এসব অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে আশপাশের বাসিন্দারা গত ২৬ এপ্রিল রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর একটি যৌথ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও এখনো কোনো সুরাহা মেলেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ–রাজউকের অথরাইজড অফিসার জান্নাতুল মাওয়া, ইন্সপেক্টর অমিত হাসান, পরিচালকসহ একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশেই এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, রাজউকের জোনাল অথরাইজড অফিসার জান্নাতুল মাওয়ার কাছে অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার তো মিলছেই না, উল্টো নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে অভিযোগকারীদের। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ইন্সপেক্টর মো. অমিত হাসান যেন এই এলাকার কোনো অনিয়মই চোখে দেখেন না। ভবন নির্মাতাদের সঙ্গে রাজউক কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করেছেন এ এলাকার মানুষ। এ বিষয়ে জানতে অমিত হাসানকে ফোন করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনে ফোন কেটে দেন। পরে আবার ফোন করলে তিনি ফোন বন্ধ করে রাখেন।
জান্নাতুল মাওয়া খবরের কাগজকে বলেন, এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। ভবন নির্মাণ নির্দেশিকা না মেনে যারা কাজ করছেন, তাদের সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তারা নির্দেশ মানছেন না। শিগগির এই এলাকায় মোবাইল কোর্টের অভিযান পরিচালিত হবে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই।