ঈদ ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া গণমুখী উদ্যোগে জবাবদিহি নিশ্চিত ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নেই সংকট দূর করা সম্ভব।
সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানী তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের দুঃশাসন ও জবাবদিহিহীনতার অচলাবস্থা রাতারাতি বদলে ফেলা অসম্ভব। তবে এবারের ঈদুল আজহায় দেশের মানুষ রাষ্ট্রের আন্তরিক সদিচ্ছা ও জনকল্যাণমুখী তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে সরকার প্রমাণ করেছে যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে সংকটের মধ্যেও স্বস্তি, শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মাহদী আমিন বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের মাত্র তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। সময়ের পরিমাপে এটি হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রতিটি দিনই জনগণের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষার দিন, প্রতিটি মুহূর্তই দায়িত্ব পালনের পরীক্ষা, আর প্রতিটি পদক্ষেপই জবাবদিহি ও সেবার প্রতিফলন। আমরা এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, জনকল্যাণ এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত প্রথম এই ঈদুল আজহা উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ সর্বমহলে আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা ছিল সর্বোচ্চ, যা নিকট রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র আরও বলেন, এই কর্মযজ্ঞকে পাথেয় করে, গণমানুষের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করা এবং সুশাসনের এই ধারাকে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। জনকল্যাণের সেই আন্তরিক অগ্রযাত্রায় গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্য অনিবার্য।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া ১০টি গণমুখী পদক্ষেপ তুলে ধরেন মাহদী আমিন।
পদক্ষেপগুলো হলো-
দীর্ঘ ছুটির সিদ্ধান্ত ও ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা: নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি ছুটি এক সপ্তাহ পর্যন্ত বর্ধিত করায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন হয়েছে। তবে টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রেনে মা-মেয়ের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত করেছে। ভবিষ্যতে যেকোনো মূল্যে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সচেষ্ট থাকবে।
পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ: শ্রমবান্ধব সরকারের উদ্যোগে ঈদের আগেই প্রায় সব কারখানায় বকেয়া বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বিগত সময়ের মতো এবার বকেয়া বেতনের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ বা শিল্পাঞ্চলে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়নি।
দেশি পশুর বাজার ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ: ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ এবং দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে রাখায় দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা স্বস্তির সঙ্গে ব্যবসা করেছেন। রাস্তার বদলে খোলা জায়গায় পশুর হাট বসানোয় মানুষ যানজট থেকে রেহাই পেয়েছে। প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশুর চাহিদার বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ, যা দেশে প্রথমবারের মতো কোরবানিতে পশুর স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করেছে।
দ্রুত বর্জ্য অপসারণ ও নাগরিক সেবা: কোরবানি পরবর্তী ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকার বর্জ্য অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। ঈদের পরদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে গাড়ি চালিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে বর্জ্য অপসারণে অবহেলার দায়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও বিশেষ সুবিধা: ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কাউন্টারগুলোতে কঠোর নজরদারি ছিল। পাশাপাশি, প্রথমবারের মতো রেলে এবং মেট্রোরেলে নারীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আলাদা সংরক্ষিত কোচ বা বগি চালু এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লঞ্চে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় ৫-৮% ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটবিরোধী অভিযান: মহাসড়কে ও পশুর হাটে পশুবাহী ট্রাকে ইজারা বহির্ভূত চাঁদাবাজি রোধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, যার ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি।
লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ: তীব্র গরমের মধ্যেও ঈদের দিন এবং পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের সিংহভাগ এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতকে আরও সেবামুখী করতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব উৎস ব্যবহারে সচেষ্ট।
সামাজিক সংবেদনশীলতা ও জননিরাপত্তা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোরবানি-সংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়ের ওপর কঠোর নজরদারি ছিল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প নামক আলোচিত মহিষটিকে সংরক্ষণ ও চিড়িয়াখানায় প্রেরণের মাধ্যমে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
চামড়া শিল্পের দাম নির্ধারণ ও তদারকি: কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য আগেভাগেই নির্ধারণ করে দেওয়ায় এবার চামড়া অবিক্রীত থাকার বা নষ্ট হওয়ার হার অনেকটাই কমেছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল: বিশেষ টাস্কফোর্সের নিয়মিত বাজার তদারকির কারণে উৎসবের সুযোগ নিয়ে খুচরা বাজারে হঠাৎ দাম আকাশচুম্বী করার প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা গিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিস রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা প্রমুখ।