একদিকে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্যদিকে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙা করতে বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতা সামাল দেওয়াই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।...
দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা এখন চরমে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানবোধের জায়গাটি সঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। শ্রেণিবিভেদ প্রতিটি ক্ষেত্রে বিস্তর। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ ফিকে হতে বসেছে। এ দেশের তরুণ প্রজন্ম গত তিন মাস আগে একটি বৃহৎ আন্দোলনে শরিক হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও বঞ্চনার সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। তেমনিভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত হিংসা-বিদ্বেষ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার আকাঙ্ক্ষাও।
আমাদের সংস্কৃতিটা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে জিঘাংসা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ বা কাউকে ছোট করে কথা বলে এক ধরনের তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন অনেকে। এটা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে এখন চিন্তা করতে হচ্ছে। শিক্ষাগুরুর মর্যাদা ভূলণ্ঠিত হতে চলেছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে পারিবারিক শিক্ষার মান বজায় রাখার জন্য অভিভাবকদের প্রচেষ্টাও খুব একটা চোখে পড়ছে না। অথবা প্রচেষ্টা থাকলেও তা কাজে আসছে না। সামাজিকভাবে আমরা এগুলো কখনো চিহ্নিত করার চেষ্টা করিনি।
আমরা সম্প্রতি লক্ষ করেছি, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দাবিদাওয়া নিয়ে সরব বিভিন্ন পক্ষ। দাবি আদায়ে নানামুখী তৎপরতা চোখে পড়ছে। এ পর্যন্ত শতাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে হাজারের বেশি দাবিদাওয়া জানানো হয়েছে। বিভিন্ন পেশার মানুষ কখনো বিক্ষোভ, কখনো রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করেছেন। কোথাও কোথাও যানবাহনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়েছে। উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে মবের মাধ্যমে। সরকার একটি সমস্যার সমাধান করতে না করতেই আরেকটি সমস্যা সামনে আসছে।
একদিকে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্যদিকে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙা করতে বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতা সামাল দেওয়াই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন এই সরকারের কাছে দাবি আদায় করার মোক্ষম সময় এটি। ফলে তাদের মধ্যে প্রত্যাশার বিপরীতে হতাশা, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, নানা পক্ষের উসকানি, সহিংস মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের পাশাপাশি মানুষের মনোজগতের পরিবর্তনের বিষয়ে মন্তব্য এসেছে রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকেও। সম্প্রতি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিরোধ থেকে কাউকে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে রেললাইন অবরোধ করেন। সেখানে চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশু রক্তাক্ত হয়। গত কয়েক দিনে রাজধানীতে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে ক্যাম্পাস, সেই সঙ্গে লুট করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যবান জিনিসপত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসব সংবাদ। এরই মধ্যে গুজব-সংবাদ ভর করেছে গোটা দেশে। কোনটা সঠিক তা বুঝতেও সাধারণ মানুষকে বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ইসকন নেতা চিন্ময় দাসের গ্রেপ্তারের পর তার অনুসারীরা বিক্ষোভ করেছেন। চট্টগ্রামের আদালত থেকে চিন্ময় দাসকে কারাগারে নেওয়ার চেষ্টাকালে তার সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় এক আইনজীবীকে ধরে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই ইস্যু নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা না করতে সরকার থেকে বলা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সভা করে ‘জাতীয় সংহতি সপ্তাহ কর্মসূচি’ ঘোষণা করেছেন। সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে বলে সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন। শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। তরুণ প্রজন্ম বইয়ের পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এটা গোটা জাতির জন্য অশনিসংকেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রেজাউল করিম মনে করেন, যখন কোনো বিপ্লব হয়, তখন এ রকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। সরকারের গতিবিধির ওপর তা নির্ভর করে। গত ১৬ বছরে সবকিছু একটা ধারায় অভ্যস্ত ছিল। নতুন পরিস্থিতিতে হয়তো সব বিভাগ সহযোগিতা করছে না। এগুলো সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কৌশল হতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডকে নিরপেক্ষভাবে দেখলে সব গ্রুপ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নাও হতে পারে। তারা সরকারকে দুর্বল মনে করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। সে রকম যদি হয় তাহলে এটি কোনো শুভ লক্ষণ নয়।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, সরকারের এগুলোর বিরুদ্ধে পরিষ্কার এবং খুব শক্ত অবস্থান নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে, তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। তারা এসব নিয়ে কথা বলছে না। তারা শুধু ভোটের কথাই বলছে, ভোটের রাজনীতি করতে চায়। সমাজে নানা রকম দ্বন্দ্ব, বিরোধ, শক্তি আছে। ফ্যাসিবাদ কোনো সরকার নয়; এটি একটি আদর্শ। সেই আদর্শ সমাজের মধ্যে বিদ্যমান। ফ্যাসিবাদের মূল জায়গাটা হচ্ছে গণতন্ত্রের অভাব, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব, কর্তৃত্ববাদ, ক্ষমতার আস্ফালন- এসব আছে সমাজের মধ্যে। ছাত্রদের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন দরকার। ছাত্র সংগঠনগুলোর অতীত ইতিহাস রয়েছে। তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার থ্রি-জিরো তত্ত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে যুবসমাজের প্রত্যেকের থ্রি-জিরো পারসন হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। এই উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কারণ তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। দেশের সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এ তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটানো খুবই প্রয়োজন। দেশের দারিদ্র্য ও বেকারত্ব শূন্যে নামিয়ে আনার যে চেষ্টা প্রধান উপদেষ্টা তার তত্ত্বে দেখিয়েছেন, তা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আশা করছি, এই তত্ত্বটি তরুণ প্রজন্মের সহিষ্ণু মনোভাব গড়ে ওঠার ওপরও গুরুত্ব দেবে। যাতে করে থ্রি-জিরো ক্লাবে যুক্ত হয়ে এ দেশের যুবসমাজ মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরমতসহিষ্ণু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ প্রজন্মের মধ্যে সে শক্তি ও তারুণ্য রয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত হোক, মমত্ব ও ভ্রাতিত্ববোধ প্রতিষ্ঠা হোক, সেটিই কাম্য।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ
বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ প্রাপ্ত (পল্লি উন্নয়ন) এবং স্থানীয় সরকার গবেষক
.jpg)
.jpg)
