অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। আমাদের দেশে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। সম্প্রতি তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমেনি বরং বেড়েই চলছে। পণ্যের আমদানি শুল্কে ছাড় দিয়েও সেসব পণ্যের দাম খুব একটা কমছে না।
এখানে প্রথম কথা হচ্ছে- পণ্যের দাম নির্ভর করে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। আমাদের চাহিদাও অনেকটা কমে গেছে মনে হচ্ছে। কেননা, ব্যাংকে ঋণের সুদহার বেড়েছে, সরবরাহ বাড়েনি। তাছাড়া পণ্য সরবারহে সমস্যা আছে। ট্রাম্পের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ প্রত্যাহার নিয়েও ইতোমধ্যে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমছে না বরং বাড়ছেই। বর্তমানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি এবং সর্বোপরি রিজার্ভের কথা চিন্তা করলে- সবমিলিয়ে পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ অপেক্ষাকৃত অনেক কম। এক দশক ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২০ শতাংশের কিছু ওপরে সীমাবদ্ধ থাকছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাছাড়া বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু করণীয় আছে। প্রথমত, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত খুব একটা সন্তোষজনক নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবশ্যই ভালো করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো, ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও নানা রকমের সমস্যা আছে। তৃতীয়ত, ইজ-অব-ডুয়িং-বিজনেস যে সূচকে আছে, সেই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। এর মধ্যে বেশ কিছু সাব-ইন্ডিকেটরস আছে। সেগুলোর উন্নতি হওয়া দরকার। এ বিষয়গুলো যদি আমরা সমন্বয় করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় যে, অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
দেশের সাধারণ জনগণ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। তার কারণ হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে কারণে উচ্চমধ্যবিত্তের মানুষ হয়তো তাদের সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার মানটা রক্ষা করতে পারে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো সঞ্চয় নেই। এ মানুষগুলোর জীবনমান ক্রমশই নিম্নমুখী হচ্ছে। এখানে যা করতে হবে; সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যেসব প্রকল্প আছে তা যেন সুষ্ঠুভাবে কার্যকর করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ভিডিপি, ভিডিএফ, ফ্রিডম ফাইটার অ্যালাউন্স- এদের অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম অভিযোগ আছে। যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পায় না। যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা পায়। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কারচুপি হয়। এমনও দেখা যায় যে, খাদ্যসহায়তার কাজ যাদের দায়িত্বে থাকে তারা নিজেরা সরাসরি কারচুপির সঙ্গে জড়িত থাকে। সেখানে গুদামে রক্ষিত মালামাল অনেক সময় ধরাও পড়ে। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। যারা এ ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
বর্তমানে প্রধান চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি কমানো। দ্বিতীয়ত হচ্ছে- আমাদের বৈদেশিক বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন হচ্ছে। সেটাকে স্থিতিশীল করার জন্য আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে। অনেকেই আমদানি কমানোর কথা বলতে পারে। কিন্তু আমদানি কমালে আমাদের মতো দেশে, যেখানে আমদানিপণ্য বেশির ভাগই শিল্পের কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্য- এগুলোতে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হবে। তাহলে সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে। দেশে আমদানি খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়া আরেকটা বড় রকম সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানির তুলনায় তা অনেক কম। এর ফলে বিশাল এক ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। আমদানি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে।
এখানে একটা বিষয় খুব তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। দেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাচার হয়েছে। পাচার অর্থ ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যখন ডলারের দাম বৃদ্ধি পায় তখন রপ্তানিকারকরা লাভবান হন। প্রবাসীরাও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হন। সে ক্ষেত্রে করের আওতা বাড়াতে হবে। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের সবার কাছ থেকে কর আদায় করতে হবে। কাজেই আমাদের রপ্তানি কীভাবে আমরা বাড়াতে পারি, সে জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। আমাদের প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠায় সেটা সাম্প্রতিকালে কিছুটা বেড়েছে। এ ধারাটা বজায় রাখতে হবে। সব মিলিয়ে এ কাজগুলো করতে পারলে টাকার মান বেশি হতে পারে। কাজেই এটা বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আমি একবার ভোজ্য তেলের ওপর আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়ার পর দেখা গেল, পরের দিন দাম বেড়ে গেল। তখন এদের যে অ্যাসোসিয়েশন আছে, তাদের ডেকে বললাম, আপনারা যা করছেন তা ঠিক হচ্ছে না। আপনারা নিজেরাই আমদানি শুল্ক সমন্বয় করে দাম যেটা ন্যায্য হওয়া উচিত, সেই দামে আনেন। তা না হলে আমি অন্য ব্যবস্থা নেব। আপনাদের ব্যাংকঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেব। অতীতে যে ঋণ আছে সেগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। এসব বলার পর দাম কিছুটা কমেছিল। সিন্ডিকেট নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়- এখনো সিন্ডিকেট আছে এবং তা ব্যাপকভাবেই আছে। এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। মাঝেমাঝে আমরা দেখি অপারেশন হয়। সেই অপারেশনে কয়জনকে ধরা হয়, কয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেটা নিয়ে আলোচনার বিষয় থাকতে পারে।
মোটামোটিভাবে সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য আমি মনে করি, বর্তমানে যে আইন আছে ‘প্রটেকশন অব কনজ্যুমার লাইফ’- সে আইনের যথাযোগ্য বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে এর মাত্রা বাড়ানো যেতে পারে। বর্তমানে পলিসি মেকার বা নীতিনির্ধারক যারা আছেন তাদের এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। কাজেই মূল্যস্ফীতির অভিঘাত রক্ষার পাশাপাশি আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আমাদের রপ্তানি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুশাসনের দিকে নজর দিতে হবে।
লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।


.jpg)